২৩ বছর আগে টেস্ট আঙিনায় পা রাখার শুরুতে ক্যাঙ্গারুদের দেশে গিয়ে যে বাংলাদেশ বারবার কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, সময় বদলে আজ সেই অস্ট্রেলিয়ার বুকেই ইতিহাস তৈরি করছে লাল-সবুজের দল। ডারউইনের মাঠে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে পেছনে ঠেলে দিয়ে টেস্টের লাগাম এখন শক্ত হাতে ধরে রেখেছে সফরকারী বাংলাদেশ। বল হাতে তরুণ পেসার হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটের চোখধাঁধানো স্পেলের পর ব্যাট হাতে বাইশ গজে আগুন ঝরিয়েছেন তানজিদ হাসান। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরি করার অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন তিনি।
ডারউইন টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ১ উইকেটে ৯৬ রান নিয়ে খেলতে নামে বাংলাদেশ। প্রথম দিনে দলীয় ৩৬ রানে ওপেনার সাদমান ইসলামের বিদায়ের পর ইনিংস সামলানোর মূল দায়িত্ব নেন তরুণ তানজিদ হাসান ও অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক। দ্বিতীয় উইকেটে এই দুজনের ১০২ রানের চমৎকার জুটিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে করা ১৯৮ রানের জবাবে দারুণ ভিত্তি পায় বাংলাদেশ। তবে দুর্ভাগ্যবশত শত রানের এই জুটির পর জশ হ্যাজলউডের অফস্টাম্পের বাইরের একটি ফুলার লেংথের বলে উইকেটের পেছনে অ্যালেক্স ক্যারির হাতে ক্যাচ তুলে দেন মুমিনুল। ৯৫ বলে ৮টি চার মেরে ৪৯ রান করে মাঠ ছাড়েন তিনি। মাত্র ১ রানের জন্য অর্ধশতক হাতছাড়া করে মুমিনুল যখন ১৩৮ রানে বিদায় নেন, তখন ক্রিজে নামেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
মুমিনুলের বিদায়ের পরও উইকেটে বিন্দুমাত্র মনোযোগ হারাননি তানজিদ। ১০২ বলে ফিফটি পূর্ণ করার পর মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যাওয়ার সময় তিনি ৭৪ রানে অপরাজিত ছিলেন। লাঞ্চের আগে প্রথম সেশনে মাত্র ১ উইকেট হারিয়ে স্কোরবোর্ডে আরও ৮৫ রান যোগ করে বাংলাদেশ। বিরতির পর শান্তর সাথে মিলে রানের চাকা সচল রাখেন তিনি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ৭৪ বলে নিজের অর্ধশতক পূরণ করেন, ফলে তানজিদ-শান্তর জুটিও একশর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
অবশেষে ম্যাচের ৬৪তম ওভারে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। অভিজ্ঞ অফস্পিনার নাথান লায়নের বল লং অফে ঠেলে দিয়েই সিঙ্গেলের জন্য ছোটেন তানজিদ। দৌড়ানোর মাঝপথেই উল্লাসে মেতে ওঠেন, নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে পৌঁছে হেলমেট খুলে দুই হাত উঁচিয়ে উদযাপন করেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। ১৮৮ বলে ৮টি চার ও ১টি ছক্কায় সাজানো ছিল তাঁর এই মহাকাব্যিক ইনিংস। তবে শত রান স্পর্শ করার পরপরই কিছুটা অসাবধান হয়ে পড়েন তিনি। একই ওভারে লায়নের একটি হাওয়ায় ভাসানো বল লং অফের উপর দিয়ে মারতে গিয়ে মিচেল স্টার্কের হাতে ক্যাচ দেন তানজিদ। ১৯৪ বলে ১০১ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলে তিনি যখন সাজঘরে ফেরেন, ততক্ষণে বাংলাদেশের দলীয় স্কোর ২০০ পেরিয়ে গেছে।
সেঞ্চুরির ঠিক আগেই অবশ্য তানজিদ ব্যাকফুটে গিয়ে পয়েন্ট দিয়ে চোখধাঁধানো চার মেরে দলের রান ২০০ স্পর্শ করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে প্রথম ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ লিড এনে দেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২ উইকেট হারিয়ে ২৩০ রান তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে ইতিমধ্যেই ৩২ রানের লিড নিশ্চিত করেছে শান্তর দল। অধিনায়ক শান্ত ও ক্রিজে আসা নতুন ব্যাটার এখন এই লিডের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে নেওয়ার দিকেই নজর দিচ্ছেন। ডারউইনের মাটিতে বল ও ব্যাট—দুই বিভাগেই লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা যেভাবে আধিপত্য দেখাচ্ছে, তাতে বলা যায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ এখন পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতেই।









