জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুলাই ২০২৬, ৯:৪০ পিএম

উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপের দেশ ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্নই কাল হলো মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার যুবক সোহাগ মুন্সীর (২৫)। দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ার মাফিয়া আস্তানায় বন্দি জীবন এবং অমানুষিক শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। জমিজমা ও সহায়-সম্পদ বিক্রি করে কয়েক দফায় মোট ৬০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পরও শেষ রক্ষা হয়নি; শেষ পর্যন্ত নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তাকে। হত্যার পর সোহাগের লাশ গুম করে ফেলার অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনেরা।
মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার মজুমদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ আলী মুন্সীর ছেলে সোহাগ পেশায় একজন রংমিস্ত্রি ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অভাব অনটন দূর করতে স্থানীয় মানবপাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়েন তিনি। চক্রের মূল দুই সদস্য ময়না আক্তার ও জুলহাস সরদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রথম কিস্তিতে ২২ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন সোহাগ। কিন্তু চুক্তি ভঙ্গ করে তাকে সরাসরি ইউরোপ না পাঠিয়ে প্রথমে সৌদি আরব এবং পরে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে পাচার করে দেওয়া হয়।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সোহাগকে মানবপাচারকারী মাফিয়াদের একটি গোপন আস্তানায় জিম্মি করা হয়। সেখানে তাকে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে সেই করুণ আর্তনাদের ভিডিও বাংলাদেশে থাকা পরিবারের কাছে পাঠানো হতো। ছেলেকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পেতে নিঃস্ব হয়ে কয়েক দফায় আরও ৩৮ লাখ টাকা দালালদের হাতে তুলে দেয় পরিবার। এভাবে সর্বমোট ৬০ লাখ টাকা দেওয়া সত্ত্বেও মুক্তি মেলেনি সোহাগের।
নিহতের পরিবার সূত্রের ভাষ্যমতে, পরবর্তীতে সোহাগকে দেশে ফেরত পাঠানোর নাম করে আরও দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এরপর গত ২৩ জুলাই নতুন করে আরও ২৭ লাখ টাকা দাবি বসে তারা। ২৪ জুলাই সকাল ৮টার মধ্যে টাকা না পাঠালে সোহাগকে মেরে ফেলার চূড়ান্ত হুমকি দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত টাকা পরিশোধ করতে না পারায় মাফিয়ারা তাকে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। দীর্ঘ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার পর গত বুধবার বিভিন্ন সূত্রে পরিবার নিশ্চিত হয় সোহাগ আর বেঁচে নেই। বৃহস্পতিবার সকালে এ সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
স্থানীয় অধিবাসীদের দাবি, কেবল সোহাগই নন—একই দালাল চক্রের মাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে লিবিয়া গিয়ে উপজেলার অন্তত আরও ১১ জন যুবক বর্তমানে মাফিয়াদের আস্তানায় বন্দি অবস্থায় চরম নির্যাতন সহ্য করছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই মানবপাচারকারী চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে এবং দ্রুত সোহাগের নিথর দেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের আকুল আবেদন জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ড ও মানবপাচারের সার্বিক বিষয়ে মাদারীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার বিমল চন্দ্র বর্মন জানান, ঘটনার পর নিহত সোহাগের মা শাহিনুর বেগম বাদী হয়ে রাজৈর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এজাহার পাওয়ার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামলার অন্যতম প্রধান আসামি জুলহাস সরদারকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। তিনি আরও জানান, পাচারকারী চক্রের মূল হোতারা বিদেশে অবস্থান করায় এবং দেশে তাদের সহযোগীরা প্রতিনিয়ত আত্মগোপন স্থান পরিবর্তন করায় তাদের আইনের আওতায় আনতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে, তবে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য