,

দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের পাতে কমছে আমিষ

রাজধানীর বাজারে একের পর এক আমিষজাতীয় খাবারের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। গরু ও খাসির মাংসের পাশাপাশি একসময় তুলনামূলক সাশ্রয়ী হিসেবে বিবেচিত ডিম, ব্রয়লার মুরগি, পাঙাশ ও তেলাপিয়াও এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আয় না বাড়লেও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় পরিবারের খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকা দরে। কয়েক সপ্তাহ আগেও একই পরিমাণ মাংসের দাম ছিল প্রায় ৮০০ টাকা। অর্থাৎ কেজিতে দাম বেড়েছে ৫০ টাকা। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।

খাসির মাংসের দামও বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এখন তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে। ফলে বাজারভেদে ক্রেতাকে কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।

ডিম-মুরগি-মাছেও বাড়তি খরচ

নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায় গরু বা খাসির মাংস নিয়মিত না থাকলেও ডিম, মুরগি ও মাছ দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম খরচে আমিষের চাহিদা মেটানোর অন্যতম উপায়। কিন্তু এসব পণ্যের দামও বাড়ায় সেই বিকল্পগুলোও এখন আগের মতো সহজলভ্য থাকছে না।

খুচরা বাজারে এক ডজন ফার্মের ডিমের দাম উঠেছে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০০ টাকা এবং পাঙাশ ও তেলাপিয়ার দাম কেজিতে ২৪০ টাকা পর্যন্ত। ফলে সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য প্রতিদিনের বাজারের হিসাব আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

একটি পরিবারের খাদ্য বাজেট যখন নির্দিষ্ট থাকে, তখন কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়লে অন্য কোনো পণ্যের পরিমাণ কমানোর প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে যাদের দৈনিক বা অনিয়মিত আয়ের ওপর সংসার চলে, তাদের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও সরাসরি দেখা যায়। মাসের শুরুতে যে খাবারের তালিকা করা হয়, বাজারদর বাড়লে মাস শেষ হওয়ার আগেই তা বদলে ফেলতে হয়।

৬৫০ টাকার আয়ে সংসার চালানোর লড়াই

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা ভ্যানচালক আমিনুল ইসলাম সজিবের কথায় উঠে এসেছে এই বাস্তবতার চিত্র। সারারাত ভ্যানে পণ্য সরবরাহ করে তার আয় প্রায় ৬৫০ টাকা। এই অর্থ দিয়েই তাকে পরিবারের খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় সামলাতে হয়।

আমিনুল জানান, আগে এক থালা ভাতের সঙ্গে একটি ডিম খাওয়া সম্ভব হলেও এখন ডিম কেনার সময়ও হিসাব করতে হয়। গরুর মাংস তার পরিবারের জন্য প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। ব্রয়লার মুরগিও অনেক দিন আগে কিনেছিলেন বলে জানান তিনি।

মাছের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দামের পাঙাশ ও তেলাপিয়ার ওপর নির্ভরতা থাকলেও সেগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ছোট মেয়ের মাংস খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সীমিত আয়ের কারণে সব সময় তা পূরণ করতে পারেন না তিনি।

আমিনুলের দৈনিক ৬৫০ টাকা আয়ের সঙ্গে বাজারদরের তুলনা করলে মূল্যবৃদ্ধির চাপের একটি দিক স্পষ্ট হয়। গরুর মাংসের কেজিতে ৫০ টাকা বাড়তি দাম তার এক দিনের আয়ের প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশের সমান। অর্থাৎ একই পরিমাণ মাংস কিনতে শুধু মূল্যবৃদ্ধির কারণেই তাকে আগের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

অবশ্য নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু গরুর মাংসের দাম বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ডিম, মাছ বা মুরগির মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী খাবারের দাম বাড়াটাই তাদের খাদ্যাভ্যাসে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এসব খাবারই অনেক পরিবারের নিয়মিত আমিষের উৎস।

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাবারের তালিকায়

আয়ের একটি বড় অংশ যদি চাল, ডাল, তেল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেই চলে যায়, তাহলে আমিষজাতীয় খাবারের জন্য আলাদা অর্থ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার প্রথমে কমিয়ে দেয় অপেক্ষাকৃত ব্যয়বহুল খাবার। এরপর ডিম, মাছ বা মুরগির মতো খাবারেও পরিমাণ কমানোর চাপ তৈরি হয়।

এর প্রভাব শুধু বাজারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের সদস্যদের খাবারের ধরন ও পরিমাণেও পরিবর্তন আসে। আগে সপ্তাহে কয়েকবার যে খাবারটি কেনা হতো, সেটি হয়তো মাসে একবার কেনা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের শিশুদের চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ কারণেই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বাজারদরের সামান্য পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। দৈনিক আয়ের তুলনায় ২০, ৩০ বা ৫০ টাকা বাড়তি খরচ অনেক সময় পুরো দিনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের হিসাব পাল্টে দিতে পারে।

নজরদারি জোরদারের দাবি

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ কষ্টে রয়েছেন। তার অভিযোগ, বাজারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডিমের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বাজারে তদারকি চলছে। কেউ কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তবে কোনো পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ পরিস্থিতি, পরিবহন খরচ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্য এবং বাজারের চাহিদা—সবকিছুর প্রভাব খুচরা দামে পড়তে পারে। তাই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ নির্ধারণে পুরো সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারসাজির অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

রাজধানীর বর্তমান বাজারচিত্রে নিম্ন আয়ের মানুষের সংকটের জায়গাটি মূলত ক্রয়ক্ষমতায়। গরু বা খাসির মাংস অনেক পরিবারের নিয়মিত খাবার না হলেও ডিম, মাছ ও মুরগি ছিল তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী আমিষের উৎস। এসব পণ্যের দামও যখন বাড়তে থাকে, তখন বাজারে পণ্য পাওয়া গেলেও তা কেনার সক্ষমতা কমে যায়।

ফলে শুধু বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাই নয়, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে দাম রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ একটি পরিবারের আয় যদি একই থাকে, অথচ প্রতিদিনের খাদ্যপণ্যের খরচ বাড়তে থাকে, তাহলে সবচেয়ে আগে সংকুচিত হয় সেই খাবারের তালিকা, যেগুলোকে তুলনামূলকভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব। আমিষজাতীয় খাবারও সেই তালিকায় পড়ে যাচ্ছে—যার প্রভাব এখন রাজধানীর নিম্ন আয়ের পরিবারের বাজারের হিসাবেই স্পষ্ট।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।