নিহত আজমল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এলাকার বড় সলুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মো. কুতুব উদ্দিন। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে খুলনার ইসলামনগর এলাকার একটি মেসে ঘটনাটি ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। বর্তমানে তাঁর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু বিরোধ
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, আজমল যে মেসে থাকতেন, সেখানে খাবারের জন্য আগে থেকে মিল নিশ্চিত করার নিয়ম ছিল। সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জানিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করতে হতো। ঘটনার রাতে আজমল কাউকে না জানিয়েই অন্য একজনের জন্য রাখা ভাত খেয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেসের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে আজমলের বিরুদ্ধে টাকা চুরির অভিযোগ তোলা হয়। এরপর মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগও সামনে আসে।
স্বজনদের দাবি, আজমলকে মেসের পাঁচতলা ভবনের ছাদে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। তাঁর মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মারধরের একপর্যায়ে তিনি ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন।
তবে তিনি ঠিক কীভাবে ছাদ থেকে পড়ে গেলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, নাকি মারধরের সময় কোনোভাবে পড়ে যান—এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফলে মৃত্যুর ঘটনাটিকে ঘিরে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
বাবার কাছে চাওয়া হয় এক লাখ টাকা
নিহত আজমলের বাবা মো. কুতুব উদ্দিনের দাবি, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে তাঁর ছেলে ফোন করে ঘটনার কথা জানান। আজমল তাঁকে বলেছিলেন, কাউকে না জানিয়ে ভাত খাওয়াকে কেন্দ্র করে মেসে ঝামেলা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে টাকা চুরির অভিযোগও করা হচ্ছে বলে তিনি বাবাকে জানান।
এরপর মেসের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে আজমলের বাবার ফোনে কথা হয়। তাঁদের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন কুতুব উদ্দিন। তিনি বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানান।
কিন্তু পরে আজমল গুরুতর আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
চুরি নিয়ে একাধিক অভিযোগের কথা শোনা যায়
মেসে রান্না ও খাবার সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত এক নারী জানান, তিনি নিয়মিত মেসের সদস্যদের জন্য রান্না করে খাবার দিয়ে আসতেন। ঘটনার দিন আজমল আগে থেকে না জানিয়েই খাবার খেয়েছিলেন বলে তিনি জানতে পারেন। পরে মেসের অন্য সদস্যরা তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন এবং তিনি খাবার খাওয়ার কথা স্বীকার করেন বলে ওই নারী জানান।
তবে মারধরের কারণ শুধু খাবার খাওয়ার বিষয় ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ওই নারী জানান, আজমলের বিরুদ্ধে ভাতের পাশাপাশি টাকা, মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগের কথাও তিনি শুনেছেন।
এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ করে চুরির অভিযোগগুলো কার কাছ থেকে এসেছে, সেগুলোর কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না এবং সেগুলো মারধরের ঘটনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে—এসব বিষয় তদন্তের অংশ বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে লাঠি জব্দ
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন জানিয়েছেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করেছে। সেখানে আজমলকে মারধরের প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। ঘটনাস্থল থেকে মারধরে ব্যবহৃত একটি লাঠিও জব্দ করা হয়েছে।
আজমলের বাবার কাছে ফোন করে এক লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই ফোনকলের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা জানতে কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) চাওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ঘটনাটির পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আজমলকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের কেউ কেউ দ্রুত সেখান থেকে চলে যান—এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তদন্তে এ বিষয়টিও যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনার সময় মেসে কারা ছিলেন, কে বা কারা আজমলকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার আগের সময়টিতে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
আজমল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কানাই লাল সরকার ঘটনাটিকে রহস্যজনক হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আজমল সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার আইনগত নিষ্পত্তির বিষয়ে পরিবারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, ফোনকলের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা না হলেও তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে মেসের নিরাপত্তা, পারস্পরিক বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শারীরিকভাবে নিপীড়নের মতো গুরুতর প্রশ্নও সামনে এসেছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা প্রয়োজন। আজমলের পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।








