খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই জুলাই ২০২৬, ৮:০ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তে নজিরবিহীন অসঙ্গতি ও জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। বেশ কিছু মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। কোথাও মামলার কথিত ‘শহীদ’ জীবিত অবস্থায় বহাল তবায়নে বিদেশে অবস্থান করছেন, আবার কোথাও মামলার বাদীর কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাচ্ছে না খোদ পুলিশ। কোনো কোনো মামলায় গুলিতে নিহত বা আহত হওয়ার দাবি করা হলেও তদন্তে তার বিন্দুমাত্র সত্যতা মেলেনি। উল্টো ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে ঘটনার সময় ঘটনাস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে থাকা নিরীহ মানুষকে আসামি করার প্রমাণ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নেপথ্যের প্রেক্ষাপট ও মামলার পরিসংখ্যান
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর হামলায় ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মোহাম্মদপুরের বছিলা ও রামপুরায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই তীব্র দমন-পীড়ন শেষ পর্যন্ত এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানে এই অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যুর ধারণা দেওয়া হলেও সরকারি গেজেট মোতাবেক এই সংখ্যা সাড়ে আটশোর কাছাকাছি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ৫০টি থানায় মোট ৭০৭টি মামলা হয়েছে, যাতে এজাহারনামীয় আসামির সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯ জন। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানায় সর্বোচ্চ ১৯টি মামলা দায়ের হয়। এছাড়া পল্টন মডেল থানায় ১৬টি, হাতিরঝিল ও ভাটারা থানায় ৭টি করে, রামপুরায় ৫টি এবং উত্তরা ও সংলগ্ন থানায় ১৩টি মামলা রুজু হয়। বর্তমানে ১২৬টি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও তার সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৯টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।
সৌদি আরবে ভালো আছেন ‘শহীদ’ বাবু!
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই হাতিরঝিলের উলন সড়কে পুলিশের গুলিতে ৪৬ বছর বয়সী মো. বাবু নিহত হয়েছেন—এমন অভিযোগ এনে শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলার বাদী হিসেবে ‘নিহত’ বাবুর খালাতো ভাই ইসমাঈলের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়। তবে ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর আদালতে জমা দেওয়া হাতিরঝিল থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাসেল ইসলামের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এক অবিশ্বাস্য সত্য বেরিয়ে আসে।
তদন্তে জানা যায়, এজাহারে উল্লেখিত ঠিকানায় (চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বরুরকান্দি গ্রাম) বাবু নামে কেউ মারা যাননি। তার প্রকৃত নাম মো. শাকিল এবং তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে সৌদি আরব থেকে একটি ভয়েস মেসেজে শাকিল বলেন, “আমি তো মারা যাইনি ভাই। আমি মরলে সৌদি আরব আসলাম কীভাবে? এখন আমি সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি।”
শুধু তাই নয়, মামলার কথিত বাদী ইসমাঈলকে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে খুঁজে পাওয়া গেলে তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এবং আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে জানান, তিনি এমন কোনো মামলা করেননি। তার নাম-পরিচয় ও জাল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কোনো এক অজ্ঞাত চক্র এই ভুয়া মামলাটি দায়ের করেছে। মামলার সঙ্গে সংযুক্ত মৃত্যুসনদটিও সম্পূর্ণ জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। আগামী ৩ আগস্ট ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মিথ্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কাটাছেঁড়ার দাগকে গুলিবিদ্ধ বলে দাবি!
একই ধরনের আরেকটি চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে পল্টন থানার একটি মামলায়। ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর ইয়াসিন আরাফাত নামের এক যুবক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার দাবি ছিল, ১৯ জুলাই পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে পারভেজ আলী (২৪) নামের এক যুবক গুলিতে নিহত হন এবং তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।
মামলাটির তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআইয়ের তদন্তে ‘পারভেজ আলী’ নামের কথিত নিহত ব্যক্তির কোনো অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। আর বাদী ইয়াসিন আরাফাতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই মো. মাসুদ রানা জানান, আরাফাতের পায়ে পুরনো কোনো কাটাছেঁড়ার দাগকে তিনি গুলির চিহ্ন হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এর সপক্ষে তিনি কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেটও দেখাতে পারেননি। এমনকি তার বাবা বিল্লাল হোসেন গাজীও ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর জানতেন না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে ঢাকায় একটি বেসরকারি টিভিতে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন। গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলম জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া। মূলত পাবনার দুই ট্রাকচালক আব্দুল মতিন ও নাজমুল হাসানের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ইয়াসিন আরাফাত এই ঢাকা কেন্দ্রিক মামলায় তাদের আসামি করেন। আসামিদের কল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, ঘটনার দিন তারা পাবনাতেই ছিলেন। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর এই মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পিবিআই।
আদাবরের মামলায় বাদীই ‘লাপাত্তা’
অনুরূপভাবে আদাবর থানায় তোহা খান নামের এক ব্যক্তির দায়ের করা একটি হত্যা মামলাকেও সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন হিসেবে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ১৯ জুলাই আদাবরে আওয়ামী লীগের হামলায় আলী মিয়া নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার এসআই তরুণ কুমার জানান, তদন্তে এই ঘটনার কোনো সত্যতা মেলেনি। এজাহারে বাদীর যে মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভুয়া। আদাবরের নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে তোহা খান নামের কোনো বাসিন্দার অস্তিত্ব পায়নি পুলিশ। এজাহারের ভাষা ও আসামির তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটিও একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের কাজ।
আইনগত ব্যবস্থা ও বিচার প্রক্রিয়ায় প্রভাব
গণঅভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে পুঁজি করে এমন ঢালাও ও ভুয়া মামলার ঘটনা সামনে আসায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “ অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব ভুয়া মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।” তিনি আরও যোগ করেন, প্রতিটি ফৌজদারি মামলা স্বতন্ত্র হলেও, যখন একের পর এক এমন ভুয়া মামলা সামনে আসে, তখন বিচারকদের মানসিকতায় একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে প্রকৃত শহীদ ও ভুক্তভোগীদের মামলার বিচার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, তদন্তে যেসব মামলা ভুয়া প্রমাণিত হচ্ছে, আইন অনুযায়ী সেই সব ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে জুলাইয়ের সংবেদনশীল ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সরকার যদি বিশেষ কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা ভিন্ন বিষয়।
মন্তব্য