খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ৪:৩৮ পিএম

পুলিশের বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী দুটি ইউনিট—অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)—এর নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি তাদের দায়িত্বের পরিধি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতা, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিস্তার এবং নতুন ধরনের হুমকি মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এ প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পুলিশ সদর দপ্তর (পিএইচকিউ) গত ৭ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রস্তাবে এটিইউর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)’ করার অনুমোদন চেয়েছে। তাদের মতে, দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরাপত্তা ঝুঁকির ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শুধু সহিংস উগ্রবাদ নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নানা ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত দায়িত্বসম্পন্ন একটি কাঠামো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
একই ধারাবাহিকতায় ৮ জুন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে পাঠানো পৃথক এক চিঠিতে সিটিটিসির নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট-ডিএমপি (এসএসইউ-ডিএমপি)’ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা আরও শক্তিশালী করা এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্গঠন করতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নাম পরিবর্তন হলেও সন্ত্রাসবাদ দমনসহ বিদ্যমান মূল দায়িত্বগুলো বহাল থাকবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ অভিযানের কারণে এসব ইউনিট নিয়ে যে জনমনে কিছু নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, নতুন সাংগঠনিক পরিচয় সেই ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি এবং আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পরিচিতি গড়ে তোলাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) পক্ষে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক স্বাক্ষরিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তার এবং তথ্যপ্রবাহের গতি বাড়ার ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির ধরন আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন শুধু সরাসরি হামলার পরিকল্পনা নয়, বরং ডিজিটাল মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন, প্রচারণা এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির মতো কৌশলও ব্যবহার করছে। ফলে প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোকে আধুনিক ও বহুমাত্রিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা জরুরি বলে মনে করছে পুলিশ।
২০১৬ সালে রাজধানীর হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী হিসেবে এটিইউ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই হামলায় ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জন নিহত হন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে এটিইউ। বর্তমানে ইউনিটটির অনুমোদিত জনবল ৬২০ জন এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি দেশজুড়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উগ্রবাদী সংগঠনগুলো ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা ব্যবহার করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উসকানিমূলক প্রচারণা চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে তরুণদের উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ করে গোপন ‘স্লিপার সেল’ গড়ে তোলার চেষ্টার কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় এটিইউকে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট’-এ রূপান্তরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন কাঠামোর আওতায় ইউনিটটি শুধু জঙ্গিবাদ দমনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, জাতীয় স্থিতিশীলতা এবং জননিরাপত্তা রক্ষার বিস্তৃত দায়িত্বও পালন করবে। একই সঙ্গে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট’ নামটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অধিক পরিচিত হওয়ায় বিদেশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা আরও সহজ হবে বলে মনে করছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের দাবি, এই পুনর্গঠন ও নাম পরিবর্তনের জন্য সরকারের অতিরিক্ত কোনো অর্থ ব্যয় হবে না।
তবে এই প্রস্তাবকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট দুই ইউনিটের ভেতরে কিছু উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এটিইউ ও সিটিটিসির দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত সংস্থার ওপর অতিরিক্ত ও বহুমুখী দায়িত্ব আরোপ করা হলে তাদের মূল দক্ষতা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এটিইউর এক কর্মকর্তা বলেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বিশেষায়িত বাহিনীকে যদি বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে জঙ্গিবাদ দমনের মতো মূল দায়িত্বে মনোযোগ কমে যেতে পারে। একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করে সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, শুধু নাম পরিবর্তনের ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্বে পরিবর্তন না এলেও ভবিষ্যতে অতিরিক্ত দায়িত্ব যুক্ত হলে ইউনিটটির বিশেষায়িত সক্ষমতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
মন্তব্য