খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ৯:৫০ পিএম

ঢাকার দোহার উপজেলায় ঋণের কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে এনজিও কর্মকর্তাদের মানসিক চাপ ও আপত্তিকর আচরণের জেরে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যুর এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় ঋণদাতা সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের ওপর তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করেছিলেন। এমনকি বাড়ি বয়ে এসে গালিগালাজ ও পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানোর কারণে লজ্জায় ও অভিমানে অসুস্থ হয়ে প্রথমে মেয়ে এবং পরবর্তীতে মা মারা যান।
মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে দোহার উপজেলার লটাখোলা সংলগ্ন খালপাড় ও নাগেরকান্দা এলাকায়। নিহতরা হলেন—খালপাড় এলাকার মৃত শেখ শহীদের স্ত্রী লাভলী আক্তার (অসুস্থ হয়ে গত ২৪ জুন মারা যান) এবং তার বৃদ্ধ মা রেহানা বেগম (গত সোমবার রাতে মারা যান)।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে লাভলী আক্তার তার ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠানোর জন্য ‘রুরাল কনস্ট্রাকশন নিউনেশন’ নামের একটি এনজিওর দোহার উপজেলার বটিয়া শাখা থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নেন। তবে বিদেশে যাওয়ার পর তার ছেলে নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারছিলেন না। ফলে লাভলী আক্তারের পক্ষে ঋণের সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির টাকা সময়মতো পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। গত ছয় মাস ধরে তিনি পুরোপুরি ঋণখেলাপি হয়ে পড়েন। এর পর থেকেই এনজিওর মাঠকর্মী ও কর্মকর্তারা টাকা আদায়ের জন্য লাভলীকে নানাভাবে মানসিক চাপ ও হুমকি দিতে শুরু করেন।
এনজিও কর্মকর্তাদের নিয়মিত তাগাদা ও দুর্ব্যবহারের হাত থেকে বাঁচতে এবং লজ্জায় লাভলী আক্তার একপর্যায়ে নিজের ঘর ছেড়ে উপজেলার নাগেরকান্দা এলাকায় তার মায়ের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও তার শেষ রক্ষা হয়নি। গত ২৪ জুন এনজিওর এক কর্মকর্তা নাগেরকান্দার ওই বাড়িতে চড়াও হন এবং বকেয়া টাকার জন্য লাভলীকে চরমভাবে ধমকাতে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশ ডেকে এনে তাকে হাতকড়া পরিয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো হয়। এই ঘটনার পরই তীব্র আতঙ্কে লাভলী আক্তার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই দিন সন্ধ্যার পর তাকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার এখানেই শেষ নয়। লাভলী আক্তারের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই পরিবারের ওপর নেমে আসে আরেক আঘাত। স্বজনদের অভিযোগ, মেয়ের মৃত্যুর সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই বকেয়া ঋণের টাকার জন্য লাভলীর বৃদ্ধ মা রেহানা বেগমকে চাপ দেওয়া শুরু হয়। গত সোমবার রাতে এনজিওর লোকজন তাদের বাড়িতে এসে রেহানা বেগমের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করে।
রেহানা বেগমের ছেলে ও নিহত লাভলীর ভাই নুরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বৃদ্ধ মা এই ঋণের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তারপরও এনজিওর লোকজন আমাদের বাড়িতে এসে মায়ের ওপর চড়াও হয় এবং পুলিশের ভয় দেখায়। ওই সময় তীব্র আতঙ্কে ঘরের সিঁড়িতে দাঁড়ানো অবস্থায় মা স্ট্রোক করে নিচে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান। এনজিওর অমানবিক চাপের কারণেই আমি আমার মা ও বোনকে হারিয়েছি। আমি এই অন্যায়ের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ‘রুরাল কনস্ট্রাকশন নিউনেশন’ এনজিওর বটিয়া শাখার ব্যবস্থাপক আনোয়ার জাহিদ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “লাভলী আক্তার গত ছয় মাস ধরে কিস্তি দিচ্ছিলেন না। আমরা নিয়ম অনুযায়ী টাকা আদায়ের চেষ্টা করেছি। তবে তিনি মারা যাওয়ার পর আমরা তার ঋণ মওকুফ করার আইনি প্রক্রিয়ার জন্য মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যু সনদ চাইতে তার মায়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। টাকার জন্য তার মাকে কোনো ধরনের চাপ দেওয়া বা গালিগালাজ করা হয়নি।”
এদিকে পাঁচ দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের দুজনের এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, “এনজিওর কিস্তির জন্য মানুষের ওপর এমন জুলুমের ঘটনা এই এলাকায় নতুন নয়। এদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনা দরকার।”
দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুবকর সিদ্দিক জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে দুটি লাশই উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী পরিবার লিখিতভাবে অভিযোগ জানালে সংশ্লিষ্ট এনজিওর লাইসেন্স ও কার্যক্রম খতিয়ে দেখে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্তব্য