খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ৯:৪১ পিএম

চলতি বিশ্বকাপ চলাকালেই পেনাল্টি শুটআউট বা টাইব্রেকারের নিয়ম নিয়ে এক নাটকীয় প্রস্তাব তুলেছিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। তবে টুর্নামেন্টের মাঝপথে এমন আকস্মিক পরিবর্তনের চেষ্টা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ফুটবলার, বিশ্লেষক ও ফুটবলপ্রেমীদের আপত্তির মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পুরোপুরি সরে আসতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি।
৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ এখন নকআউট পর্বের চরম উত্তেজনায় জমে উঠেছে। নতুন সংযোজন ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর প্রথম ম্যাচে লস অ্যাঞ্জেলেসে দক্ষিণ আফ্রিকাকে শেষ মুহূর্তের গোলে হারিয়ে প্রথম দল হিসেবে শেষ ১৬-এর টিকিট কেটেছে কানাডা। নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মিনিটে স্টিফেন ইউস্তাকিওর গোলেই নিশ্চিত হয় কানাডার এই নাটকীয় জয়। অন্যদিকে, হিউস্টনে এশিয়ার পরাশক্তি জাপানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ১৬-এ জায়গা করে নিয়েছে ব্রাজিল। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আর্সেনাল তারকা গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির দুর্দান্ত গোল ব্রাজিলকে অতিরিক্ত সময়ের লড়াই এড়িয়ে সরাসরি জয় এনে দেয়।
এই ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর লড়াই মাঠে গড়ানোর ঠিক আগেই খবর আসে, পেনাল্টি শুটআউটের নিয়ম নিয়ে হুট করেই এক বড় পরিবর্তনের দাবি তুলে বসেছে ফিফা। ফুটবলের নিয়মকানুন নির্ধারণী আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএফএবি’র (IFAB) সঙ্গে এক জরুরি আলোচনায় বসে ফিফা প্রস্তাব দেয়, টাইব্রেকারের আগে প্রচলিত দুটি টসের বদলে মাত্র একটি টস করা হোক।
ফিফার প্রস্তাব ছিল—দুই অধিনায়কের মধ্যে মাত্র একবারই কয়েন টস করা হবে। সেই একক টসে যিনি জিতবেন, তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন তার দল আগে শট নেবে নাকি কোন পোস্টে শট নেওয়া হবে (পোস্ট নির্বাচন)। অন্যদিকে টসে হেরে যাওয়া অধিনায়ক বাকি থাকা অপশনটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ফিফার যুক্তি ছিল, এর ফলে টাইব্রেকার প্রক্রিয়াটি আরও নিখুঁত ও নিরপেক্ষ হবে এবং কোনো দলই একসঙ্গে দুবার টস জিতে বাড়তি মানসিক সুবিধা পাবে না।
তবে ক্রীড়াভিত্তিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইএফএবি-এর সঙ্গে ফিফার এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে। বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টের মাঝপথে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয় বলে মনে করছে আইএফএবি। ফলে চলতি বিশ্বকাপে বর্তমান ও প্রচলিত নিয়মই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিবিসি-র ফুটবল বিশ্লেষক ডেল জনসনের মতে, আইএফএবি অবশ্য প্রাথমিকভাবে একক টসের এই নিয়মটি ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করতে রাজি হয়েছিল। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মতো হাই-ভোল্টেজ মঞ্চে নয়, বরং ভবিষ্যতের অন্য কোনো ঘরোয়া বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এটি পরীক্ষা করে দেখা হতে পারে।
আইএফএবি-র এই অনড় অবস্থানের কারণে চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তবে আগের মতোই দুবার টস করা হবে। প্রথম নিরপেক্ষ টসটির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে কোন দল আগে শট নেবে। আর দ্বিতীয় টসটির মাধ্যমে ঠিক করা হবে মাঠের কোন পাশের পোস্টে পেনাল্টি শটগুলো নেওয়া হবে। সাধারণত দ্বিতীয় টসটির কল করার দায়িত্ব থাকে দুই দলের অধিনায়কদের ওপর।
সম্প্রতি বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে এই দুই টসের ভাগ্যেই পিএসজি-র কাছে হেরে গিয়েছিল আর্সেনাল। যেখানে গ্যাব্রিয়েল মাগালাইসের নেওয়া শেষ শটটি বারের ওপর দিয়ে চলে গেলে নিজেদের শিরোপা ধরে রাখে প্যারিসের ক্লাবটি।
ফুটবল ইতিহাসে টসের এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে আছে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল। লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে টাইব্রেকারের আগে এই টসের ভাগ্য নিজেদের পক্ষে পেয়েছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। ফলে নিজেদের হাজার হাজার উন্মত্ত সমর্থকদের গ্যালারির সামনের পোস্টে পেনাল্টি শট নেওয়ার বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা পেয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। অবশ্য সেই ম্যাচে ফ্রান্সের অধিনায়ক হুগো লরিস দ্বিতীয় টসটি জিতে তার দলকে টাইব্রেকারে আগে শট নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধে জয়ী হয় আর্জেন্টিনাই; ১২ গজ দূর থেকে গনসালো মন্তিয়েলের সেই ঠান্ডা মাথার শট আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছিল তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি। ফিফার নিয়ম বাতিলের সিদ্ধান্তে তাই স্বস্তি ফিরেছে ফুটবল মহলে।
মন্তব্য