খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ৭:২১ পিএম

জনপ্রিয় মিউজিক্যাল ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘কোক স্টুডিও বাংলা’র চতুর্থ সিজনের দ্বিতীয় গান ‘মেঘ’ প্রকাশের পর থেকেই তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে। বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই গানটি নিয়ে দর্শক ও শ্রোতাদের মধ্যে এক ধরনের বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে মুক্তির মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গানটির সংগীতায়োজন, সুরের গাঁথুনি এবং বিশেষ করে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ‘সোনার তরী’ কবিতার আধুনিক উপস্থাপন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ইউটিউব থেকে শুরু করে ফেসবুকের বিভিন্ন দেওয়ালে এখন এই গানটি নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও হতাশা প্রকাশ।
এক মাসের দীর্ঘ বিরতির পর মুক্তি পাওয়া ‘মেঘ’ গানটিতে যৌথভাবে কণ্ঠ দিয়েছেন কণ্ঠশিল্পী মোহাম্মদ শোয়েব, মাশা ইসলাম ও মৌসুমি। বরাবরের মতোই গানটির প্রধান সংগীত প্রযোজক ও মূল সংগীতায়োজকের দায়িত্বে ছিলেন দেশের প্রখ্যাত সুরকার শায়ান চৌধুরী অর্ণব। এই গানে মূলত শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগের সঙ্গে আধুনিক পপ ও হিপহপ সাউন্ডের একটি ফিউশন বা সংমিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা করেছিলেন অর্ণব। গানে গীতিকার স্মরণ দত্তের মূল কথার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতাকে সম্পূর্ণ নতুন সুরে ও হিপহপধর্মী র্যাপ স্টাইলে পরিবেশন করা হয়েছে। আর এই অংশটিই সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে বোদ্ধামহল—কাউকে সহজে নিতে পারছে না।
গানটি প্রকাশের পর থেকেই ইউটিউবের কমেন্ট বক্সে সাধারণ শ্রোতারা তাঁদের চরম হতাশার কথা ব্যক্ত করছেন। একজন শ্রোতা মন্তব্য করেছেন, “গানটি ঠিক জমল না। কোক স্টুডিওর আগের ‘রুম ঝুম’ গানটি পর্যন্ত সবকিছু চমৎকার ছিল, কিন্তু এই গানটি একেবারেই ফিকে হয়ে গেছে।” অন্য একজন লিখেছেন, “গানের সংগীতায়োজনসহ বাকি সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, তবে মাঝখানে ‘সোনার তরী’ কবিতাটি জোর করে গুঁজে না দিলেই মনে হয় ভালো হতো।” অনেকেই আবার ক্ষোভ প্রকাশ করে রসাত্মক ভঙ্গিতে লিখেছেন, “ঘোড়ার ডিম বানিয়েছেন ভাই, চমৎকার হয়েছে!” কেউ কেউ এটিকে সরাসরি “দ্য বেস্ট অখাদ্য এভার” বলে অভিহিত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গানটি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ট্রোল ও ট্র্যাজিক কমেডি ঘরানার মিমও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে রসিকতা করে বলছেন, ‘সোনার তরী’ কবিতার এই হিপহপ সংস্করণের কল্যাণে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কবিতাটি আরও দ্রুত এবং ভালোভাবে মাথায় গেঁথে থাকবে।
সাধারণ নেটিজেনদের পাশাপাশি গানটির এই অদ্ভুত রূপান্তর নিয়ে খোদ দেশের সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল থেকেও তীব্র আপত্তি উঠেছে। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক হ্যান্ডেলে গানটির কঠোর সমালোচনা করে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন:
“যেকোনো নিরীক্ষা করা শিল্পীর অধিকার। সমালোচনা করা শ্রোতার অধিকার। ‘সোনার তরী’ কবিতার এর চেয়ে খারাপ রূপ আর কিছু হতে পারত না। আমাদের ছোট নদী এইভাবে গাওয়া যায়, সোনার তরী নয়। কবিতাটা ওরা বোঝেনি। এক্সপেরিমেন্টের জন্য অভিনন্দন। করুণভাবে ফেইল করার জন্য শোক। ১০-এ মাইনাস ১০।”
আনিসুল হকের এই পোস্টের পর গানটি নিয়ে বিতর্ক আরও উসকে উঠেছে। রবীন্দ্র-কবিতার অন্তর্নিহিত দর্শন ও গাম্ভীর্যকে নষ্ট করে এই ধরনের সস্তা পপ ঘরানার উপস্থাপন কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে নতুন করে তর্ক শুরু হয়েছে। এই বিপুল সমালোচনা ও বিতর্কের বিষয়ে কোক স্টুডিও বাংলার প্রধান সংগীত প্রযোজক শায়ান চৌধুরী অর্ণবের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সংগীত মহলে এখনও এক ধরনের ধোঁয়াশা ও অস্বস্তি বিরাজ করছে।
মন্তব্য