একুশের স্মৃতি, সংগ্রামের শক্তি

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কথাশিল্পী জহির রায়হান তাঁর উপন্যাস আরেক ফাল্গুন-এ ১৯৫৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের এক তীব্র আবহ নির্মাণ করেছিলেন। উপন্যাসের এক স্মরণীয় দৃশ্যে দেখা যায়, আন্দোলনকারীদের জেলে ঢোকানোর সময় কর্তৃপক্ষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তখন এক তরুণ আন্দোলনকারী উচ্চারণ করে—“আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব।” এই উচ্চারণ শুধু সাহিত্যিক কল্পনা নয়; বরং পরবর্তী ইতিহাসে বারবার বাস্তবতার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এসেছে।

একুশ: স্মৃতি থেকে সংগ্রামের ভিত্তি

জাতিগত ও সামষ্টিক পরিচয় কখনোই স্বতঃসিদ্ধ নয়; তা নির্মিত হয় ইতিহাস, স্মৃতি ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি সেই নির্মাণপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় উপাদান। ভাষার জন্য প্রাণদানকারী শহীদদের স্মৃতি একটি জাতির আত্মপরিচয়কে দৃঢ় ভিত্তি দেয়। এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় একুশ একটি সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত।

যদিও ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের ইতিহাস আরও পূর্বকাল থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, তথাপি একুশের প্রভাব ও গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। রাজনৈতিক সমাজে এই ঘটনার শক্তি এতটাই প্রবল যে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীও একুশকে নিজেদের বয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে।

প্রতীক থেকে প্রেরণা

একুশ কেবল একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি প্রতিরোধের প্রতীক এবং আন্দোলনের প্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যখনই জনগণ রাস্তায় নেমেছে, তখন একুশের চেতনা তাদের শক্তি জুগিয়েছে।

বিশিষ্ট রাজনীতিক ও লেখক আবুল মনসুর আহমদ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের আগে ঐতিহাসিক ২১ দফা প্রণয়নের সময় একুশ থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে “২১” সংখ্যা নিজেই একটি প্রতীকী শক্তি বহন করে। সেই ভাবনা থেকেই ২১ দফা কর্মসূচি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে জনতার আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দেয়।

বিভিন্ন সময়ের আন্দোলনে একুশের প্রভাব

নিম্নের সারণিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলনে একুশের প্রতীকী ও বাস্তব প্রভাব তুলে ধরা হলো—

সময়কালআন্দোলনের ধরনএকুশের ভূমিকা
১৯৫২ভাষা আন্দোলনরাষ্ট্রভাষার দাবিতে আত্মত্যাগ, জাতীয় চেতনার ভিত্তি
১৯৫৪যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন২১ দফা কর্মসূচির অনুপ্রেরণা
১৯৬৯গণঅভ্যুত্থানদেয়ালচিত্র ও স্লোগানে প্রতিবাদের ভাষা
১৯৭১মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালশপথ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক
১৯৮৯স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার
২০২৪গণ-অভ্যুত্থাননতুন প্রজন্মের স্লোগান ও প্রতিরোধের ভাষা

১৯৬৯ থেকে ১৯৭১: দ্রোহের আগুন

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের উন্মুক্ত মঞ্চ। শহীদ মিনারের আশপাশে আঁকা দেয়ালচিত্র ও লেখা স্লোগানগুলোতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পায়। সেখানে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালে পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক রূপ নেয়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে শেখ মুজিবুর রহমান শহীদদের নামে শপথ নিয়ে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। একুশ তখন আর কেবল ভাষার দাবি নয়, বরং স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতীক।

স্বাধীনতার পর একুশ

স্বাধীনতার পর একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হতে শুরু করে। তবে এর প্রকৃত শক্তি আনুষ্ঠানিকতার বাইরে, জনগণের আন্দোলনে। যখনই রাষ্ট্র বা সরকার নিপীড়নের পথে হেঁটেছে, একুশের চেতনা জনগণকে প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ করেছে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিশেষ করে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর শাসনামলে, একুশ ছিল প্রতিবাদের অন্যতম প্রতীক। রাজনৈতিক নেতারা এই দিনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছেন, ছাত্রসমাজ প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে একুশ

সাম্প্রতিক সময়েও একুশের প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে দেয়ালজুড়ে লেখা হয়েছে—“আসছে ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হব।” নতুন প্রজন্ম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে নিজেদের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছে। শহীদ মিনার আবারও হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু।

ভবিষ্যতের পথে একুশ

গত সাত দশকের ইতিহাস প্রমাণ করে, একুশ বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামী চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। অন্যায়, শোষণ ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে একুশ বারবার মানুষের কণ্ঠে ভাষা এনে দিয়েছে।

আজ যখন বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক যাত্রার দ্বারপ্রান্তে, তখন একুশ আমাদের সামনে একটি নৈতিক অঙ্গীকার তুলে ধরে—রাষ্ট্র যেন নাগরিকের অধিকার হরণ না করে, গণতন্ত্র যেন অক্ষুণ্ণ থাকে।

যদি আবারও অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে একুশের চেতনা আবার জেগে উঠবে। সেই চেতনা স্মরণ করিয়ে দেয়—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”—এ শুধু গান নয়, এটি সংগ্রামের অমর শপথ।