খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জুন ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

সারা দেশে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অসহনীয় লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় দিন-রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে বিস্তীর্ণ এলাকা। এর মধ্যে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় লোডশেডিং হওয়ায় গ্রাহকদের ক্ষোভ রূপ নিয়েছে সহিংসতায়। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ কার্যালয় ভাঙচুর, মহাসড়ক অবরোধ, কর্মকর্তাদের হুমকি এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদামতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে ভুতুড়ে বিল ও বিদ্যুৎ বিভাগের প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন গ্রাহকেরা।
Table of Contents
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডানের ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ না থাকায় নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সকাল সোয়া আটটার দিকে প্রায় অর্ধশতাধিক উত্তেজিত যুবক কার্যালয়ে এসে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করেন। এতে ভবনের বেশ কয়েকটি জানালার কাচ ভেঙে যায়। আকস্মিক এই হামলায় আতঙ্কে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘরের দরজা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন। পরে পুলিশ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এসে পরিস্থিতি শান্ত করলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়।
কেন্দুয়া পল্লী বিদ্যুতের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. ওমর ফারুক জানান, উপজেলায় ৯৪ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে পিক আওয়ারে চাহিদা যেখানে ২৭ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ মিলেছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট। ১২টি ফিডারের মধ্যে মাত্র দুটি চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল। এই ঘাটতির কারণেই ক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়েছে, যার প্রেক্ষিতে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়েছে শেরপুরেও। সেখানে খেলা চলাকালে লোডশেডিং হওয়ায় নকলা ও ঝিনাইগাতী বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্রাহকেরা হট্টগোল করেন। অনেক কর্মকর্তা মুঠোফোনে প্রতিনিয়ত হামলার হুমকি পাচ্ছেন। শেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. আখতারুজ্জামান জানান, জেলায় ৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি গ্রাহকের জন্য ৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপার ও পাঁচ থানার ওসির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে পল্লী বিদ্যুতের সাবস্টেশনের সামনে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করেন দেলদুয়ার ও মির্জাপুর উপজেলার কয়েক হাজার গ্রাহক। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বারবার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো সমাধান না পেয়ে তারা সড়ক অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছেন। পরে মির্জাপুর থানা পুলিশ ও বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের আশ্বাসের পর প্রায় এক ঘণ্টা পর অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
এদিকে এই অঞ্চলের তীব্র বিদ্যুৎসংকট নিরসনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল। চিঠিতে তিনি জানান, নাগরপুরে ১ লাখ ১০ হাজার গ্রাহকের ১৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ১০ মেগাওয়াট এবং দেলদুয়ারে ৯০ হাজার গ্রাহকের ২২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ১৫ মেগাওয়াট।
ঢাকার দোহারে অতিরিক্ত ও ভুতুড়ে বিল আদায় এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুতের কার্যালয় ঘেরাও করে মানববন্ধন করেছেন গ্রাহকেরা। দুপুরের দিকে নুরপুর এলাকায় ঢাকা-দোহার সড়ক আটকে বিক্ষোভ শুরু হলে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয়। দোহার পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মো. বাদল মিয়া জানান, গরমের কারণে ৬৫ হাজার গ্রাহকের ২৫ মেগাওয়াট চাহিদার বড় অংশই পূরণ করা যাচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত বিলের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
অনুরূপভাবে, ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে ‘মানবকল্যাণ সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বক্তারা বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান জানান, সাড়ে ১১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা মাত্র ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে একদল অজ্ঞাতপরিচয় মানুষ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে ঢুকে কর্তব্যরত লাইনম্যানকে ভয়ভীতি দেখায় এবং ৩৩ কেভি এসিআর (অটোমেটিক সার্কিট রিক্লোজার) বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। লাইনম্যান কৌশলে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. মোখলেছুর রহমান খান জানান, ৪৫ হাজার গ্রাহকের জন্য ১১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৫-৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলছে।
এদিকে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মচমইল বাজারে লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে পল্লী বিদ্যুতের একটি জনসচেতনতামূলক প্রচার গাড়ি ও পিকআপ ভ্যান আটকে দেয় ক্ষুব্ধ জনতা। মাইকিংয়ে গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার আহ্বান এবং রাত ৯টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করার অনুরোধ জানালে সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে প্রচার গাড়িটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জিএম মো. ফকরুল আলম জানান, রাতে ১৩১ মেগাওয়াটের বিপরীতে মাত্র ৭২ থেকে ৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রকৃত গভীরতা বুঝতে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর চাহিদা ও প্রাপ্তির পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
| জেলার নাম / এলাকা | মোট গ্রাহক সংখ্যা | পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ চাহিদা | বর্তমান বিদ্যুৎ সরবরাহ | ঘাটতির পরিমাণ |
| কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) | ৯৪,০০০ | ২৭ মেগাওয়াট | ৭ মেগাওয়াট | ২০ মেগাওয়াট |
| নাগরপুর (টাঙ্গাইল) | ১,১০,০০০ | ১৫ মেগাওয়াট | ১০ মেগাওয়াট | ৫ মেগাওয়াট |
| দেলদুয়ার (টাঙ্গাইল) | ৯০,০০০ | ২২ মেগাওয়াট | ১৫ মেগাওয়াট | ৭ মেগাওয়াট |
| দোহার (ঢাকা) | ৬৫,০০০ | ২৫ মেগাওয়াট | ১২.৫ মেগাওয়াট (প্রায়) | ১২.৫ মেগাওয়াট |
| শেরপুর (সমগ্র জেলা) | ৩,২৪,২৪৪ | ৭০ মেগাওয়াট | ৩৫ মেগাওয়াট | ৩৫ মেগাওয়াট |
| ঝালকাঠি (শহর ও পার্শ্ববর্তী) | – | ১১.৫ মেগাওয়াট | ৬.৫ মেগাওয়াট (গড়ে) | ৫ মেগাওয়াট |
| কোম্পানীগঞ্জ (সিলেট) | ৪৫,০০০ | ১১ মেগাওয়াট | ৫.৫ মেগাওয়াট (গড়ে) | ৫.৫ মেগাওয়াট |
| নাটোর পিবিএস-১ (দিন) | – | ১২০ মেগাওয়াট | ৬৪ মেগাওয়াট (গড়ে) | ৫৬ মেগাওয়াট |
| নাটোর পিবিএস-১ (রাত) | – | ১৩১ মেগাওয়াট | ৭৭.৫ মেগাওয়াট (গড়ে) | ৫৩.৫ মেগাওয়াট |
মন্তব্য