খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ৫:৫৫ পিএম

চট্টগ্রামে পৃথক দুটি স্থানে সেপটিক ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার রাউজান উপজেলা এবং মহানগরীর ডবলমুরিং থানা এলাকায় এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটে। শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে এই দুই পৃথক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ঝিকুটি পাড়া এলাকায়। সেখানে স্থানীয় রতন ডাক্তার নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন বাড়ির একটি সেপটিক ট্যাংকে কাজ করতে গিয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন— রাউজানের কচুখাইন এলাকার বাসিন্দা প্রদীপ দাশ এবং বোয়ালখালীর কদুরখিল এলাকার সমীরণ দাশ। এর মধ্যে প্রদীপ দাশ বাড়ির মালিক রতন ডাক্তারের জামাতা বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রদীপ দাশ ওই বাড়ির দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে নামেন। ট্যাংকটি দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকায় ভেতরে প্রাণঘাতী বিষাক্ত গ্যাস জমে ছিল। ভেতরে নামামাত্রই তিনি অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তাকে উদ্ধার করার জন্য সমীরণ দাশ নামের আরেকজন ট্যাংকের ভেতর নামলে তিনিও বিষাক্ত গ্যাসের কবলে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সংজ্ঞাহীন হয়ে যান।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অচেতন অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে। এরপর তাদের স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অসচেতনভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ট্যাংকে নামার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই দুপুর ২টার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর ডবলমুরিং থানার ধনিয়ালা পাড়ার লাকী ম্যানশন এলাকায় প্রায় একই ধরনের আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে একজনের নাম সাকিব (২২) বলে শনাক্ত করা গেছে, তবে অন্য জনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় উদ্ধারকারীরা জানান, সেপটিক ট্যাংকটি পরিষ্কার করার জন্য তারা ভেতরে নেমেছিলেন। ভেতরে জমে থাকা মিথেন বা কার্বন মনোক্সাইডের মতো কোনো বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতায় দম আটকে তারা ভেতরেই মারা যান। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা যেকোনো বদ্ধ কূপ বা সেপটিক ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইড, মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইডের মতো মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। এই গ্যাসগুলো মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একজন মানুষকে অচেতন করে ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো সেপটিক ট্যাংক বা গভীর কূপ খোলার পর অন্তত কয়েক ঘণ্টা সেটি উন্মুক্ত রাখা উচিত। প্রয়োজনে ভেতরে আলো বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করে কিংবা কাঁচা গাছপালার ডাল ভেতরে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন যে সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন রয়েছে কি না। কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (PPE) বা অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া এসব ট্যাংকে নামা জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুই ঘটনায় সচেতনতার অভাব স্পষ্ট ছিল, যা শেষ পর্যন্ত ৪টি তাজা প্রাণ কেড়ে নিল।
মন্তব্য