খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ১১:৭ পিএম

জাতীয় উপগ্রহ ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’ এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে গত ৫টি অর্থবছরে রাষ্ট্র মোট ১৬৩ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে মহাকাশ প্রযুক্তির এই খাতটি থেকে সর্বমোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৭৬৪ দশমিক ১০ কোটি টাকা।
আজ বুধবার (২৪ জুন) জাতীয় সংসদের সাধারণ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্যটি প্রকাশ করেন। কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সংসদে এই পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত তার প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন, প্রথম স্যাটেলাইট থেকে প্রত্যাশিত আয় করতে পরিচালনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল) ব্যর্থ হয়েছে কি না। একই সাথে তিনি জানতে চান, প্রথমটির বাণিজ্যিক সাফল্য পুরোপুরি নিশ্চিত না করেই শত শত কোটি টাকা খরচে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-২’ উৎক্ষেপণের নতুন প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা কতটুকু এবং এটি আরেকটি ব্যয়বহুল ‘শ্বেত হস্তী’ প্রকল্পে পরিণত হবে না—তার নিশ্চয়তা কী।
একটি বিশেষ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য তার প্রশ্নে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ শব্দটি ব্যবহার করলেও মন্ত্রী তার আনুষ্ঠানিক জবাবে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট’ হিসেবে এটিকে উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন জাতীয় স্থাপনার নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় এই উপগ্রহের নামও সরকারি সব নথিপত্রে এখন থেকে ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট’ করা হয়েছে।
সংসদে উত্থাপিত বিএসসিএল-এর বিগত ৫ বছরের অডিট বা আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল একটি অর্থবছর বাদে বাকি সব বছরই এটি ধারাবাহিক লাভের মুখ দেখেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কাগজে-কলমে কিছুটা লোকসান দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে আয় বাড়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই আবার মুনাফার ধারায় ফিরে আসে।
বিগত ৫টি অর্থবছরের রাজস্ব ও লাভের আর্থিক বিবরণীটি নিচে দেওয়া হলো:
২০২০-২১ অর্থবছর: প্রথম দিকেই ১২৯.১১ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের বিপরীতে নিট মুনাফা ছিল ৮৪.২৫ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছর: এ বছর আয় সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০.৬৬ কোটি টাকায় এবং নিট মুনাফা আসে ৮active৫.২৯ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছর: এই বছর ১৪৭.৯৯ কোটি টাকা রাজস্ব এলেও ৭৩.৫৭ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনতে হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছর: লোকসান কাটিয়ে ১৬৯.৫৬ কোটি টাকা আয়ের বিপরীতে নিট মুনাফা হয় ২৯.৬৪ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: সর্বশেষ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৮৭.০৭ কোটি টাকা রাজস্ব আসে এবং নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৩৮.৩৬ কোটি টাকায়।
মাঝের একটি বছরে হঠাৎ লোকসানের পেছনে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২২ সালের ৩০ জুন স্যাটেলাইটের সামগ্রিক যন্ত্রপাতি ও সম্পত্তি বিএসসিএল-এর নামে হস্তান্তর করা হয়। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে মূল হিসাবে অবচয়মূল্য বা ‘ডিপ্রিসিয়েশন’ যুক্ত হতে শুরু করে। সম্পদের এই স্বাভাবিক মূল্যহ্রাস হিসাবভুক্ত করার কারণে ওই নির্দিষ্ট বছরে সাময়িকভাবে লোকসান দেখা গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে আয়ের প্রবৃদ্ধির কারণে আবার ঠিক হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ এর বাণিজ্যিক ক্ষেত্রগুলো এখন বেশ বিস্তৃত। মন্ত্রী জানান, দেশের সবকটি সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ফিড বা সম্প্রচার কার্যক্রম এখন এই দেশীয় স্যাটেলাইটের মাধ্যমেই নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা ডিটিএইচ (DTH) সেবা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভি-স্যাট সংযোগ, সমুদ্রের দূরবর্তী দ্বীপ বা চরাঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং দুর্যোগকালীন জরুরি ব্যাকআপ যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এই উপগ্রহ ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে স্যাটেলাইটের উদ্বৃত্ত ব্যান্ডউইথ বিক্রি করেও নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা বা রাজস্ব অর্জিত হচ্ছে।
সংসদে নতুন প্রকল্প নিয়ে ওঠা বিতর্কের জবাবে মন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-২’ কোনো সাধারণ বা আগেরটির মতো যোগাযোগ উপগ্রহ নয়। এটিকে মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে মূলত একটি ‘আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট’ বা ভূ-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা হিসেবে। এর মূল কাজ হবে মহাকাশ থেকে দেশের সীমানা পর্যবেক্ষণ করা। এর মাধ্যমে আমাদের দেশের কৃষি খাতের তদারকি, মৎস্য সম্পদের অবস্থান নির্ণয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস ও ক্ষতি নিরূপণ, বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী দেশি-বিদেশি জাহাজের লাইভ ট্র্যাকিং এবং সামগ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এই প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও নিখুঁত করতে বর্তমান সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনায় একটি গভীর সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করার কাজ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা কেমন হবে এবং দেশ এতে কতটা লাভবান হবে, তা এই স্টাডিতে উঠে আসবে। মন্ত্রী জানান, নতুন এই বিশেষায়িত স্যাটেলাইটটি তৈরির জন্য বিশ্বের বেশ কয়েকটি নামকরা স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা যৌথ বিনিয়োগ ও কাজের আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পাওয়া গেছে, যা কারিগরি কমিটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করছে। এই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই কেবল প্রকল্পটির বিষয়ে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মন্তব্য