ফুটবল বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবময় ইতিহাস রচনা করল পিরামিডের দেশ মিশর। গ্রুপ পর্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে মোহামেদ সালাহর দল। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই মঞ্চে দীর্ঘ ৯২ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে এটিই মিশরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম ম্যাচ জয়। এই অনন্য ও স্মরণীয় সাফল্যের ওপর ভর করে তারা শক্তিশালী বেলজিয়ামকে পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়ে নিজেদের গ্রুপের শীর্ষস্থান দখল করেছে।
প্রথমার্ধের লড়াই ও নিউজিল্যান্ডের লিড
ম্যাচের প্রথমার্ধের চিত্রটি মিশরের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। খেলার মাত্র ১৫ মিনিটে একটি চমৎকার কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে নিখুঁতভাবে মাথা ছুঁইয়ে গোল করেন নিউজিল্যান্ডের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ফিন সারম্যান। এই আকস্মিক গোলে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে মিশর। গোল হজম করার পর মিশর ম্যাচে ফেরার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও নিউজিল্যান্ডের রক্ষণ ব্যুহ ভেদ করতে পারেনি। ফলে এই ১-০ ব্যবধানের লিড বা অগ্রগতি ধরে রেখেই বিরতিতে যায় কিউইরা। প্রথমার্ধের খেলা শেষে নিউজিল্যান্ডও এক ঐতিহাসিক জয়ের স্বপ্ন দেখছিল, কারণ বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে তারা কখনো কোনো ম্যাচে জয়লাভ করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে মিশরের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও সালাহ-জাদু
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মিশরের দেখা মেলে। আক্রমণভাগের ধার বাড়িয়ে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মিশরের পক্ষে প্রথম সমতা আনেন মোস্তাফা জিকো। নিউজিল্যান্ডের গোলরক্ষক ম্যাক্স ক্রকম্বে প্রথম দফায় শটটি প্রতিহত করলেও বলটি তাঁর হাতে লেগে শেষ পর্যন্ত গোললাইন অতিক্রম করে জালে জড়িয়ে যায় এবং স্কোরলাইন হয় ১-১।
ম্যাচে সমতা আসার পর শুরু হয় মিশরের প্রাণভোমরা মোহামেদ সালাহর জাদুকরী প্রদর্শনী। ম্যাচের শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ডের দুজন ডিফেন্ডার সালাহকে কড়া নজরে আটকে রেখেছিলেন এবং তাঁর পাস দেওয়ার সমস্ত পথও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে ম্যাচের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্তে এই তারকা ফুটবলার নিজের স্বভাবসুলভ ছন্দে ফিরে আসেন। সতীর্থ মোস্তাফা জিকোর বাড়িয়ে দেওয়া বলটি ডি-বক্সের ভেতর পেয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে বোকা বানিয়ে জালে জড়িয়ে দেন সালাহ। এই দর্শনীয় গোলের সুবাদে মিশর ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
ত্রেজেগের অন্তিম গোল ও দীর্ঘ আক্ষেপের অবসান
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর নিউজিল্যান্ড ম্যাচ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। একটি গোল পরিশোধের লক্ষ্যে তারা হন্যে হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে। তবে মিশরের সুসংহত রক্ষণভাগ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিউজিল্যান্ডের সেই সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করে দেয়।
ম্যাচের শেষ দিকে মিশরের পক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন মাহমুদ হাসান ত্রেজেগে। মাঠে প্রবেশ করার মাত্র দুই মিনিটের মাথায়, নিজের পায়ের তৃতীয় ছোঁয়াতেই এক দুর্দান্ত গোল করেন তিনি। ত্রেজেগের এই গোলের ফলে নিউজিল্যান্ডের ম্যাচে ফেরার সমস্ত আশা শেষ হয়ে যায় এবং মিশরের ৩-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয়।
ম্যাচের গোল ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের পরিসংখ্যান
| সময় (মিনিট/অর্ধ) | গোলদাতা খেলোয়াড় | দলের নাম | গোলের সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
| ১৫ মিনিট | ফিন সারম্যান | নিউজিল্যান্ড | কর্নার থেকে চমৎকার হেডের সাহায্যে গোল। |
| দ্বিতীয়ার্ধ | মোস্তাফা জিকো | মিশর | গোলরক্ষকের হাতে লেগে বল জালে জড়ায়। |
| দ্বিতীয়ার্ধ | মোহামেদ সালাহ | মিশর | জিকোর পাস থেকে ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে গোল। |
| শেষ দিক | মাহমুদ হাসান ত্রেজেগে | মিশর | বদলি হিসেবে নেমে মাত্র দুই মিনিটে তৃতীয় ছোঁয়ায় গোল। |
৯২ বছরের অপেক্ষা ও ঐতিহাসিক কীর্তি
এই জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৯২ বছরের এক আক্ষেপ ও অপেক্ষার অবসান ঘটাল মিশর। এর আগে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির বিপক্ষে এক ম্যাচে জোড়া গোল করার কীর্তি স্থাপন করেছিল দলটি, তবে সেই ম্যাচে তারা জয়লাভ করতে পারেনি। ১৯৩৪ সালের পর বিশ্বকাপে তারা বারবার অংশ নিলেও আর কখনো কোনো একক ম্যাচে দুটি গোল করতে সক্ষম হয়নি মিশর। আজ সালাহ, জিকো এবং ত্রেজেগের কল্যাণে দীর্ঘ ৯২ বছর পর সেই কীর্তি পুনরায় গড়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয়টি তুলে নিল মিশর।









