ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবা হাকিমের হলফনামায় উল্লেখ করা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় তাঁর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘এলএলএম, ব্যারিস্টার এট ল’ উল্লেখ করা হলেও প্রকাশিত তথ্য ও তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলস (বুটেক্স) থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আইন বিষয়ে এমন কোনো ডিগ্রি তাঁর নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
মাহবুবা হাকিম বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের ভাগনি। চলতি বছর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে তিনি জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ৪৯ সদস্যের মধ্যে তাঁর নামও রয়েছে।
হলফনামার শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরে ‘এলএলএম, ব্যারিস্টার এট ল’ থাকার বিষয়টি সামনে আসার পরই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত। কারণ, মাহবুবা হাকিমের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে প্রকাশিত তথ্যগুলোতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্নাতক ডিগ্রির কথাই উল্লেখ রয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন বক্তব্য ও পরিচিতিতেও তাঁকে টেক্সটাইল প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাহবুবা হাকিমের ব্যাখ্যা অবশ্য ভিন্ন। তিনি বলেছেন, হলফনামায় আইন বিষয়ে ডিগ্রির তথ্যটি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মনোনয়ন-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরির সময় দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কাজটি করেছিলেন এবং পূর্বনির্ধারিত একটি ডিজিটাল ফরম্যাট ব্যবহারের সময় ভুল তথ্য কপি-পেস্ট হয়ে যেতে পারে। তাঁর প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদও জমা দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছেন।
দলীয় পক্ষ থেকেও বিষয়টিকে অনিচ্ছাকৃত যান্ত্রিক বা তথ্যগত ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দলের আমির মামুনুল হক বলেছেন, হলফনামায় থাকা তথ্যটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল দেওয়া হয়নি; কাগজপত্র প্রস্তুতের সময় অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে এমনটি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
মাহবুবা হাকিম আরও বলেছেন, বিষয়টি শুধু দলের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। মনোনয়ন-সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুতের দায়িত্ব তাঁদের ওপর থাকলেও নিজের পক্ষ থেকেও নথিগুলো আরও সতর্কভাবে যাচাই করা উচিত ছিল বলে তিনি স্বীকার করেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে অসংগত তথ্য থাকলে নির্বাচন কমিশন সেটি কীভাবে বিবেচনা করবে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, মাহবুবা হাকিমের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। অর্থাৎ, অভিযোগ এলে সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য যাচাই করে কমিশন পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হলফনামায় ভুল বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা, নথির প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য আইনি বিধান বিবেচনা করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা।
তবে বর্তমানে মাহবুবা হাকিমের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য সামনে নেই। হলফনামায় একটি তথ্য থাকার বিষয়টি যেমন যাচাইয়ের দাবি রাখে, তেমনি সেটি কীভাবে সেখানে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে প্রকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য কী ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বিষয়টির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয় কি না এবং অভিযোগ হলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নথি কীভাবে যাচাই করে তার ওপর। কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন মেনেই বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। এখন পর্যন্ত মাহবুবা হাকিম ও তাঁর দল হলফনামার অসংগতিকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।









