সরকার আগামী জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুলড্রেস, জুতা এবং পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ বিতরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে প্রতি উপজেলায় দুটি বিদ্যালয়ে এই উদ্যোগ চালু করা হবে। পরে সফলতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে সব শিক্ষার্থীকে এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। দেশের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীও এ উদ্যোগে সহায়তা করবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম বা শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ সরবরাহের কর্মসূচি চালু রয়েছে। কেনিয়ায় পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বিনামূল্যে ইউনিফর্ম দেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি ৩৭ থেকে ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে এবং ঝরে পড়ার হারও হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে কিশোরী শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ ও অল্প বয়সে মাতৃত্বের প্রবণতা কমার তথ্যও উঠে এসেছে। শ্রীলঙ্কায় ইউনিফর্মের কাপড় বা ভাউচার দেওয়া হয়, যার বড় অংশ বিদেশি সহায়তায় পরিচালিত। ভারতে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইউনিফর্ম বিতরণে ভর্তি বৃদ্ধি পেলেও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অন্যদিকে ইকুয়েডরে সময়মতো পোশাক সরবরাহ না হওয়ায় কর্মসূচিটি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা
| দেশ | কর্মসূচির ধরন | উল্লেখযোগ্য ফলাফল |
|---|---|---|
| কেনিয়া | বিনামূল্যে ইউনিফর্ম | অনুপস্থিতি ও ঝরে পড়া কমেছে |
| শ্রীলঙ্কা | ইউনিফর্ম কাপড়/ভাউচার | বিদেশি অনুদাননির্ভর ব্যবস্থা |
| ভারত | সুবিধাবঞ্চিতদের ইউনিফর্ম | ভর্তি বৃদ্ধি, সামাজিক বিতর্ক |
| ইকুয়েডর | বিনামূল্যে পোশাক | সরবরাহ জটিলতায় উপস্থিতি কমেছে |
| আর্জেন্টিনা | বিনামূল্যে বই | দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সহায়তা |
বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে “বই উৎসব”-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৩৫ কোটি বই বিতরণের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম, জুতা ও শিক্ষা-উপকরণ প্রদানের একটি প্রস্তাব তৈরি হয়েছিল। পরে করোনাকালে সরাসরি উপকরণ বিতরণের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। ২০২১ সালে প্রতিজন শিক্ষার্থীর জন্য এক হাজার টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে পোশাক ও আনুষঙ্গিক উপকরণ কেনার জন্য দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে উপবৃত্তি কার্যক্রমও চালু রয়েছে। ২০২৪ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৬৪ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী উপবৃত্তি ও টিউশন ফি পেয়েছে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়ক ট্রাস্টের মাধ্যমে ৫৪ লাখ শিক্ষার্থী আর্থিক সহায়তা পেয়েছে।
তবে গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঝরে পড়া কমাতে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম বিতরণের চেয়ে বেশি কার্যকর। স্কুলে পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করলে উপস্থিতি ১৫ দশমিক ৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ক্ষুধার কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমে যায় এবং দরিদ্র পরিবারে শিশুদের কাজে পাঠানোর প্রবণতাও বাড়ে। এ কারণে বিদ্যালয়ে খাবারের নিশ্চয়তা পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ কমাতে সহায়ক হয়।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার কিছু চিত্র
| সূচক | তথ্য |
|---|---|
| মোট গ্রাম | ৯০,০৪৯ |
| যেসব গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই | ২,৮৪৭ |
| জরাজীর্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় | ১৭,৪১৪ |
| অত্যন্ত জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন | ৬,৭০৪ |
| প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ | ৩৪,১৫৯ |
| সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ | ২৪,৫৩৬ |
প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বহু বিদ্যালয়ে এখনো অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। সরকারি তথ্য বলছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মাত্র ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ ভালো বা সম্পূর্ণ পাকা অবস্থায় রয়েছে। একইসঙ্গে শিক্ষক সংকটও বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের ৬৫ হাজার ৪৫৭টি পদের মধ্যে ৩৪ হাজার ১৫৯টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩টি পদের মধ্যে ২৪ হাজার ৫৩৬টি পদ শূন্য রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথমে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, পরে বিদ্যালয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এরপর বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচি সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হওয়া উচিত। ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ বিতরণ শিক্ষার্থীদের সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সমতার অনুভূতি বাড়াতে সহায়ক হলেও শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নে অন্যান্য মৌলিক চাহিদার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে।
