বাংলাদেশের বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তিনি কেবল একজন প্রথিতযশা পরমাণু বিজ্ঞানীই ছিলেন না, বরং স্বাধীন বাংলাদেশে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের অন্যতম কারিগরও ছিলেন। ৯ মে এই মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মেধাবী সন্তান তাঁর কর্ম ও সাধনার মাধ্যমে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে কর্মজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নির্লোভ এবং প্রচারবিমুখ থেকে দেশসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
Table of Contents
শিক্ষাজীবন ও মেধার স্বীকৃতি
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। তিনি ১৯৫৮ সালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে মেধা তালিকায় প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর: ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় এবং ১৯৬২ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা: ১৯৬৩ সালে তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে আণবিক শক্তি কমিশনে যোগ দেন। পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ এবং ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন।
ডক্টরেট ডিগ্রি: ১৯৬৭ সালে তিনি লন্ডনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাত্ত্বিক কণা পদার্থবিজ্ঞানে (Theoretical Particle Physics) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে উচ্চ প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বৈজ্ঞানিক অবদান
বাংলাদেশের উত্তর জনপদে বর্তমানে দৃশ্যমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের নেপথ্য কারিগর হিসেবে ড. ওয়াজেদ মিয়ার নাম অগ্রগণ্য। ষাটের দশক থেকেই তিনি এই প্রকল্পের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর পরিকল্পনা করছিল, তখন ড. ওয়াজেদ মিয়া পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
১. পরমাণু শক্তি কমিশন: তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সময়ে কমিশনের গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়। ২. আন্তর্জাতিক সংযোগ: আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং অন্যান্য বিশ্বসংস্থার সাথে বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ৩. রূপপুর প্রকল্পের ভিত্তি: রূপপুর প্রকল্পের কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। আজ যখন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে, তখন এর বৈজ্ঞানিক রূপরেখায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য।
প্রশাসনিক ও গবেষণামূলক কাজ
বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি তিনি প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ড. ওয়াজেদ মিয়া প্রবাসে অতিবাহিত করতে বাধ্য হন। ভারতে অবস্থানকালে তিনি সেখানকার পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেন। দেশে ফেরার পর তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ বোর্ড গঠন এবং পরমাণু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন।
তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র এবং গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
Fundamentals of Thermodynamics
Fundamentals of Electromagnetics
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ
তাঁর রচিত বিজ্ঞানের পাঠ্যবইগুলো আজও বাংলাদেশের উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা তাঁর বইগুলো বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের আধার হিসেবে স্বীকৃত।
ব্যক্তিত্ত্ব ও নৈতিক আদর্শ
ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার জীবনের সবচেয়ে অনুকরণীয় দিক ছিল তাঁর সাদামাটা জীবনযাপন ও নৈতিক দৃঢ়তা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ জামাতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করেননি। ক্ষমতার বলয়ে থেকেও তিনি নিজেকে নিভৃতচারী এক গবেষক হিসেবেই পরিচিত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত মিতব্যয়ী এবং সময়নিষ্ঠ ছিলেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে বিমুখ ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতেন। তাঁর এই নিষ্কলুষ জীবনবোধ পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য এক মহান দৃষ্টান্ত।
