আনোয়ারায় চালক ও হেলপার অপহরণ: গ্রেপ্তার ৪ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি যাত্রীবাহী মিনিবাসের চালক ও দুইজন সহকারীকে (হেলপার) অপহরণ করে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় চার অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযানে অপহৃত তিনজনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার এবং ছিনতাইকৃত মিনিবাসটি জব্দ করা হয়েছে। শনিবার (৯ মে) সন্ধ্যায় আনোয়ার থানা পুলিশের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত ও অপহরণের কৌশল

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাত সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে মো. শহিদুল ইসলামের (১৯) চালিত একটি ‘হিউম্যান হলার’ মিনিবাস আনোয়ারার চাতরী চৌমুহনী এলাকায় পৌঁছায়। ওই সময় যাত্রীবেশে কয়েকজন যুবক বরুমছড়া এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে যাওয়ার কথা বলে গাড়িটি ভাড়া নেন। বাসটিতে চালক শহিদুলের সাথে সহকারী হিসেবে ছিলেন মো. ফোরকান ও মো. জাহিদ।

মিনিবাসটি বরুমছড়া এলাকায় পৌঁছালে যাত্রীবেশী ওই যুবকেরা তাদের আসল রূপ ধারণ করেন। তাঁরা দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চালক ও দুই হেলপারকে জিম্মি করে ফেলেন। এরপর অস্ত্রের মুখে তাঁদের কাছ থেকে নগদ টাকা, ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন এবং গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে মিনিবাসসহ অপহৃতদের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়।

মুক্তিপণ দাবি ও আইনি পদক্ষেপ

অপহরণকারীরা চালক ও সহকারীদের আটকে রেখে মিনিবাসের মালিক শফিউল আলমের মুঠোফোনে কল করেন। তাঁরা অপহৃতদের প্রাণের বিনিময়ে ১ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন এবং মুক্তিপণের অর্থ নিয়ে আনোয়ারার সরকারহাট গরুর বাজার এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ঘটনার পর শুক্রবার (৮ মে) গাড়ির মালিক শফিউল আলম আনোয়ার থানায় উপস্থিত হয়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই আনোয়ার থানা পুলিশ দ্রুততর সময়ের মধ্যে অভিযানে নামার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

পুলিশি অভিযান ও আসামি গ্রেপ্তার

আনোয়ারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জুয়েল মিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ আভিযানিক দল উত্তর বরুমছড়া জামিয়া নূরানী মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে অপহরণে সরাসরি জড়িত মো. জাহেদ (২৩) ও মো. রিমনকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে অপহৃতদের অবস্থান। পরবর্তীতে উপজেলার বরুমছড়া এলাকার মোহাম্মদ আলীর টেক নামক স্থান থেকে অপহৃত চালক শহিদুল ইসলাম, হেলপার ফোরকান ও জাহিদকে উদ্ধার করা হয়। একই সময় ছিনতাইকৃত মিনিবাসটিও পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।

অভিযানের ধারাবাহিকতায় শুক্রবার রাতে তৈলারদ্বীপ এলাকায় পুনরায় অভিযান চালিয়ে এই চক্রের আরও দুইজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন— নুরুল কবির ও নুরুল মোমিন আরাফাত। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও মাদক চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র বহন এবং বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক থানায় মামলা রয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি

এ বিষয়ে আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, অভিযোগ পাওয়ার অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে অপহৃতদের অক্ষত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত চার আসামিকে শনিবার দুপুরে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই অপহরণ চক্রের সাথে জড়িত আরও কয়েকজন সদস্য বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে এবং অপরাধে ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্রসমূহ উদ্ধারের লক্ষ্যে পুলিশের একাধিক দল অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আনোয়ারার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরণের সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রকে নির্মূল করতে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনমনে স্বস্তি ফিরলেও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।