লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ১২ নিহত ও ড্রোন আক্রমণে ৩ সেনা জখম

যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যেও লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সশস্ত্র সংঘাত থামছে না। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন লেবানিজ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এর বিপরীতে হিজবুল্লাহর ড্রোন ও রকেট হামলায় অন্তত ৩ জন ইসরায়েলি সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মূলত গত কয়েকদিন ধরে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন এবং পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সীমান্ত অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

লেবাননে বেসামরিক হতাহত ও ইসরায়েলি অভিযান

লেবাননের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-এর তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৯ মে) ভোর থেকে দক্ষিণ লেবাননের ৯টি গ্রাম লক্ষ্য করে বাসিন্দাদের এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। সরে যাওয়ার সতর্কতা দেওয়ার পরপরই ওই এলাকাগুলোতে বিমান হামলা শুরু হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, ইসরায়েলি বাহিনী এমন কিছু স্থানেও আক্রমণ চালিয়েছে যেগুলোর বিষয়ে আগে থেকে কোনো সতর্কতা প্রদান করা হয়নি।

শনিবারের এই ভয়াবহ হামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জন লেবানিজ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন জনপদে প্রবেশ করে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ও স্থাপনা ধ্বংস অব্যাহত রেখেছে বলে লেবানন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) দাবি, তারা মূলত হিজবুল্লাহর গোপন আস্তানা ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালনা করছে। তবে নিহতের সংখ্যার একটি বড় অংশই সাধারণ নাগরিক বলে জানা গেছে।

হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণ ও ইসরায়েলি সেনা হতাহত

ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও সীমান্তজুড়ে তাদের সামরিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। শনিবার হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন এবং রকেটের মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হিজবুল্লাহর পাঠানো একটি ড্রোন লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তের কাছে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানলে সেখানে দায়িত্বরত তিন ইসরায়েলি সেনা আহত হন। আহত সেনাদের দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, হিজবুল্লাহর ছোড়া বেশ কিছু রকেট তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝ আকাশেই ভূপাতিত করা হয়েছে। এছাড়া একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ এলাকায় গিয়ে পড়লেও সেটি শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়নি। তবে এই ড্রোন ও রকেট হামলার ফলে ইসরায়েলের উত্তর অংশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং সীমান্ত সংলগ্ন বসতিগুলোতে সতর্কসংকেত বাজানো হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য যে, গত ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল লেবানন সীমান্ত থেকে উভয় পক্ষের সেনা প্রত্যাহার এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা। তবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে।

লেবাননের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইসরায়েলি সেনারা যুদ্ধবিরতির তোয়াক্কা না করে দক্ষিণ লেবাননে ড্রোন ও বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং স্থলপথে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করছে, হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠন করছে এবং ইসরায়েলের ভেতরে ড্রোন পাঠাচ্ছে, যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দিন যত গড়াচ্ছে, হামলার ভয়াবহতা ততই বাড়ছে, যা এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে খাদের কিনারে নিয়ে ঠেলে দিয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ও মানবিক সংকট

বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘরবাড়ি ছাড়ছেন। ইসরায়েলি সতর্ক বার্তার ফলে ওই অঞ্চলগুলোতে এক ধরণের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সেবার সংকট তীব্রতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই খণ্ডযুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

এএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের দক্ষিণ লেবানন অপারেশন আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিপরীতে হিজবুল্লাহও তাদের ড্রোন প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ইসরায়েলের গভীরে আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত উভয় দেশের সীমান্তে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ বা মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো থেকে নতুন করে কোনো শান্তি প্রস্তাব বা কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা আসেনি।