শ্রীলঙ্কায় শিশু নিগ্রহের অভিযোগে জ্যেষ্ঠ বৌদ্ধ ভিক্ষু গ্রেপ্তার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শ্রীলঙ্কায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও উচ্চপদস্থ এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযুক্ত ভিক্ষুর নাম পাল্লেগামা হেমারথানা (৭১)। দেশটির ধর্মীয় ইতিহাসে এত উচ্চপদস্থ কোনো নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা বিরল। রাজধানী কলম্বোর একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে গত শনিবার তাঁকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। খবর আল জাজিরা।

ঘটনার বিবরণ ও অভিযোগের প্রেক্ষাপট

মামলার নথিপত্র এবং পুলিশি তদন্ত অনুযায়ী, ২০২২ সালে অনুরাধাপুরার অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধেয় একটি মন্দিরের ভেতরে এই যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিশুটির বয়স তখন ছিল মাত্র ৯ বছর (বর্তমানে ১১)। অভিযুক্ত পাল্লেগামা হেমারথানা ওই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, পবিত্র স্থাপনার ভেতরেই তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শিশুটির ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন।

এই অপরাধের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসার পর পুলিশ কেবল প্রধান অভিযুক্তকেই নয়, বরং শিশুটির মাকেও গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিশুটির মা এই অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন এবং তথ্য গোপন করে অভিযুক্তকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে তাঁরা উভয়েই পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হচ্ছেন।

আইনি প্রক্রিয়া ও বিচারিক নির্দেশনা

অনুরাধাপুরার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। ম্যাজিস্ট্রেট গত সপ্তাহে নির্দেশ প্রদান করেন যে, অভিযুক্ত জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুকে ‘বিলম্ব না করে’ গ্রেপ্তার করতে হবে এবং আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করতে হবে। গ্রেপ্তারের আগে অভিযুক্ত ভিক্ষু শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে কলম্বোর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে আদালতের কঠোর অবস্থানের কারণে পুলিশ হাসপাতাল থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে শ্রীলঙ্কার শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তুলেছিল যে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার কারণে হেমারথানাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ কালক্ষেপণ করছে। জনগণের ক্ষোভ এবং প্রশাসনিক চাপের মুখে তাঁর দেশত্যাগের ওপর আগেই নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban) আরোপ করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর পুলিশ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মামলার পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা অনুযায়ী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত হবে।

শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় নেতাদের নৈতিক সংকট

শ্রীলঙ্কায় যাজক বা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এর আগেও গণমাধ্যমে এসেছে। তবে পাল্লেগামা হেমারথানাই এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া সবচেয়ে সিনিয়র বা জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর এই গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতৃত্বের নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একাংশের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মাদক পাচারের ঘটনা। গত মাসে কলম্বোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তল্লাশি চালিয়ে ব্যাগভর্তি ১১০ কেজি গাঁজা পাচারের অভিযোগে ২২ জন ভিক্ষুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিমানবন্দরটির ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহত্তম মাদক পাচারের মামলা হিসেবে বিবেচিত। একের পর এক এমন বিতর্কিত ঘটনায় দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান ও জননিরাপত্তা

যৌন নিপীড়নের এই মামলাটি যেন কোনোভাবেই প্রভাবশালী মহলের চাপে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে যেন ভয়ভীতি দেখানো না হয় অথবা মামলা প্রভাবিত করার চেষ্টা যেন রুখে দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শিশু সুরক্ষা কর্মীরা মনে করছেন, এই মামলার সুষ্ঠু বিচার শ্রীলঙ্কার বিচার ব্যবস্থায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

ধর্মীয় স্থাপনায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের নৃশংস অপরাধ দমনে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে দেশটির সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ভুক্তভোগীর জবানবন্দি এই মামলার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন অভিযুক্তকে জেলহাজতে রাখা হবে কি না, তা আদালতের পরবর্তী শুনানিতে নির্ধারিত হবে। শ্রীলঙ্কার সরকার এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।