বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলে নেইমার ও ব্রাজিলের নতুন পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসন্ন আসরকে সামনে রেখে ব্রাজিল জাতীয় দলের প্রাথমিক দল গঠন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে। বিশেষ করে ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়রের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘ও গ্লোবো’ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ব্রাজিলের বর্তমান কোচ কার্লো আনচেলত্তি বিশ্বকাপের জন্য তাঁর ৫৫ সদস্যের প্রাথমিক তালিকায় নেইমারকে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘদিনের চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার লড়াইয়ে থাকা এই ফুটবলারের জন্য এটি একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

লিওনেল মেসির সমর্থন ও নেইমারের প্রয়োজনীয়তা

নেইমারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিষয়ে কেবল ভক্তরাই নন, বরং তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিও বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার একজন ইউটিউবারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি নেইমারের প্রতি তাঁর সমর্থনের কথা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন। মেসি বলেন, “নেইমারের বিষয়ে আমার নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নেই, কারণ সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি অবশ্যই চাইব সে বিশ্বকাপে খেলুক। একজন মানুষ হিসেবে সে সেখানে থাকার যোগ্য।” মেসির এই মন্তব্য ফুটবল অঙ্গনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা খেলোয়াড়দের মধ্যকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় দেয়।

আনচেলত্তির ৫৫ সদস্যের তালিকা ও এস্তেভাওয়ের সম্ভাবনা

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, কোচ কার্লো আনচেলত্তি আগামী সোমবার ৫৫ সদস্যের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করবেন। এই দীর্ঘ তালিকা থেকে যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ১৮ মে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করা হবে। এই প্রাথমিক তালিকায় চোটের কারণে বর্তমানে মাঠের বাইরে থাকা চেলসির তরুণ স্ট্রাইকার এস্তেভাওয়ের থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করাই আনচেলত্তির মূল লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নেইমারের সামনে ফিটনেস ও পারফরম্যান্সের কঠিন পরীক্ষা

প্রাথমিক তালিকায় জায়গা পেলেও চূড়ান্ত দলে থাকা নেইমারের জন্য সহজ হবে না। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী এই প্লে-মেকারকে দলে জায়গা করে নিতে হলে কঠোর ফিটনেস পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। কোচ কার্লো আনচেলত্তি শুরু থেকেই খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে আসছেন। নেইমারের প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকলেও, দীর্ঘ বিরতির পর তিনি আন্তর্জাতিক মানের গতি ও তীব্রতা সামলাতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আনচেলত্তি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “নেইমার একজন অসাধারণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় এবং তিনি আমাদের বিশ্বকাপ জেতাতে সাহায্য করতে পারেন—এটি একটি স্বাভাবিক চিন্তাধারা। তবে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি এখনো সেই উচ্চমানের ফর্ম ও ফিটনেস বজায় রেখেছেন।”

ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন ও নেইমারের ভূমিকা

ব্রাজিল সব সময়ই বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার হিসেবে মাঠে নামে। ২০০২ সালের পর থেকে তারা আর কোনো বৈশ্বিক শিরোপা জিততে পারেনি। নেইমার দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের মূল ভরসা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেলের গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়া এই ফুটবলার দেশের হয়ে বড় কোনো ট্রফি জেতার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তবে ক্রমাগত চোট তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথকে বাধাগ্রস্ত করেছে। আল-হিলালে যোগ দেওয়ার পর গুরুতর ইনজুরিতে পড়ে তিনি দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। ফলে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নামার আগে তাঁর ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে কারিগরি দল চিন্তিত।

চূড়ান্ত দল ঘোষণার সময়সূচী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আগামী ১৮ মে ব্রাজিলের ফুটবল ভক্তদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, কারণ ঐ দিনেই জানা যাবে কারা থাকছেন চূড়ান্ত ২৬ জনের তালিকায়। কার্লো আনচেলত্তি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দলে নামের চেয়ে বর্তমান ফর্ম এবং শারীরিক সামর্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। নেইমারকে যদি চূড়ান্ত দলে জায়গা পেতে হয়, তবে তাঁকে অনুশীলনে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে হবে। ব্রাজিলের এই স্কোয়াড গঠনের প্রক্রিয়ায় তরুণ খেলোয়াড়দের আধিক্য দেখা যেতে পারে, যা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বা রদ্রিগোর মতো তারকাদের সাথে নেইমারের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নেইমার দলে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ওপর একটি মানসিক চাপ সৃষ্টি হওয়া। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত দিক বিবেচনায় আনচেলত্তি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নন। নেইমারের ফিটনেস যদি শতভাগ নিশ্চিত না হয়, তবে কোচ বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাববেন—এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ফুটবল বিশ্বের নজর এখন সোমবারের সেই তালিকার দিকে, যেখানে নেইমারের নাম থাকাটা তাঁর বিশ্বকাপ যাত্রার প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।