টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় এক নারী ও এক নবজাতকের গলিত মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক ফলাফলে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ওই নারীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় এবং মরদেহে পচন ধরায় ধর্ষণের কোনো প্রাথমিক আলামত ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি। গত ২০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে মরদেহ দুটি উদ্ধারের পর আট দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় বা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঠিক কারণ উদঘাটন সম্ভব হয়নি।
Table of Contents
ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে সম্পন্ন হওয়া ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আলমগীর হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ওই নারীর মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ। তবে মরদেহের অবস্থার অবনতি হওয়ায় অন্য কোনো আলামত নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিকিৎসকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ:
নিহতের বয়স: মৃত নারীর বয়স আনুমানিক ৩০ বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শারীরিক অবস্থা ও সীমাবদ্ধতা: মরদেহ পচে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, যা পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়।
ডিএনএ পরীক্ষা: নিহত নারী ও নবজাতকের পরিচয় এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এই নমুনাগুলো উচ্চতর পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।
নবজাতকের তথ্য: পুলিশ ও চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া নবজাতকটির বয়স ছিল মাত্র এক দিন।
ডা. আলমগীর হোসেন আরও জানান, মরদেহে পচন ধরলে ধর্ষণের আলামত পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এছাড়া প্রসবের পর সাধারণত ধর্ষণের শারীরিক আলামত স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায় না।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও উদ্ধার প্রক্রিয়া
গত ২০ এপ্রিল সোমবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের গুনটিয়া গ্রামের লৌহজং নদীর তীরে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় মরদেহ দুটি উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয়দের সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় মা ও শিশুর গলিত দেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহ উদ্ধারের অন্তত এক সপ্তাহ আগে তাঁদের হত্যা করে সেখানে পুঁতে রাখা হয়েছিল। যথাযথ পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটিকে মির্জাপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও পুলিশের সতর্কতা
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে দাবি করা হয়েছে যে, ওই নারীকে ধর্ষণের পর পেটের সন্তানসহ হত্যা করা হয়েছে। কোনো কোনো পোস্টে এমন বীভৎস বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যে, ধর্ষণের এক পর্যায়ে প্রসব বেদনা শুরু হলে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয় এবং তখন মা ও শিশুকে একত্রে খুন করা হয়।
তবে মির্জাপুর থানা পুলিশ এই ধরণের তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিমূলক, বীভৎস ও মনগড়া অপপ্রচার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এই ধরণের অপপ্রচার জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে এবং তদন্তের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।”
তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি ও আইনি পদক্ষেপ
মরদেহ উদ্ধারের পরদিন স্থানীয় এক গ্রাম পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মির্জাপুর থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক জাবেদ পারভেজ জানান, হত্যার ধরণ নিশ্চিত হওয়া গেলেও খুনিদের শনাক্ত করা এখনও সম্ভব হয়নি।
তদন্তের বর্তমান পর্যায়গুলো নিম্নরূপ: ১. দেশব্যাপী বার্তা: ভিকটিমের পরিচয় শনাক্তে দেশের সকল থানায় বেতার বার্তা এবং ছবি পাঠানো হয়েছে। ২. নিখোঁজ তালিকা পর্যালোচনা: সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ হওয়া নারীদের তালিকার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া মরদেহের বর্ণনা মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ৩. ডিএনএ রিপোর্টের প্রতীক্ষা: ডিএনএ রিপোর্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি পারিবারিক যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে।
ওসি মামুন আরও জানান, পুলিশ প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে নিরলসভাবে কাজ করছে। আগামীকাল মঙ্গলবার টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নৃশংস জোড়া খুনের ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং স্থানীয় জনতা দ্রুততম সময়ে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
