জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুলাই ২০২৬, ৪:২৬ পিএম

বয়স যে ফুটবল মাঠে কেবল একটি সংখ্যা, সেই কথাটিই যেন আবারও প্রমাণ করলেন জাপানের কিংবদন্তি ফুটবলার কাজুয়োশি মিউরা। ৫৯ বছর বয়সে একটি অফিশিয়াল ম্যাচে গোল করে বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক অনন্য নজির গড়েছেন ‘কিং কাজু’ নামে পরিচিত এই ফরোয়ার্ড। দীর্ঘ প্রায় ১ হাজার ৩৫১ দিন পর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে গোলের দেখা পেলেন তিনি।
জাপানের ফুকুশিমা প্রিফেকচার ফাইনালে ইওয়াকি ফুরুকাওয়াকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এম্পেররস কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে মিউরার দল ফুকুশিমা ইউনাইটেড। বড় ব্যবধানের এই জয়ে দলের আক্রমণে সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তটি আসে মিউরার পা থেকেই। ম্যাচ চলাকালে তাঁর বয়স ছিল ৫৯ বছর ১৯৪ দিন।
এর আগে ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর জাপান ফুটবল লিগে সুজুকা ক্লাবের হয়ে সর্বশেষ গোল করেছিলেন মিউরা। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফুকুশিমা ইউনাইটেডের জার্সিতে নিজের প্রথম গোলটি করেই আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন জাপানি এই ফুটবল কিংবদন্তি।
ফুকুশিমা ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর এদিনই প্রথমবারের মতো ৫০ মিনিটের বেশি সময় মাঠে ছিলেন ৫৯ বছর বয়সী মিউরা। শুধু খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, তাঁকে দলের অধিনায়কের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের সপ্তম মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। তখন ফুকুশিমা ইউনাইটেড ইতোমধ্যে ৪-০ গোলে এগিয়ে ছিল।
গোলটির সূচনাও ছিল দারুণ। দলের ২৩ বছর বয়সী তরুণ উইঙ্গার তাকাতোরা এইনাগা ডান দিক দিয়ে একক প্রচেষ্টায় আক্রমণ তৈরি করেন। পথে তিনজন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে তিনি পেনাল্টি এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর নিচু করে একটি নিখুঁত কাট-ব্যাক বাড়ান সতীর্থের উদ্দেশে।
সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে মিউরার অভিজ্ঞতার কোনো তুলনা ছিল না। ডিফেন্ডারদের আড়াল থেকে নিখুঁত সময়ে বক্সে ঢুকে প্রথম স্পর্শেই ডান পায়ের শটে বল জালে পাঠান তিনি। ফুকুশিমা ইউনাইটেডের হয়ে এটি ছিল মিউরার প্রথম গোল।
গোলের পর মাঠে তৈরি হয় আবেগঘন এক দৃশ্য। মিউরা তরুণ সতীর্থ এইনাগাকে জড়িয়ে ধরেন। এরপর আকাশের দিকে আঙুল তুলে নিজের চিরচেনা হাসিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। সতীর্থরাও দ্রুত ছুটে এসে তাঁকে অভিনন্দন জানান। ফুকুশিমা ইউনাইটেডের এটি ছিল ম্যাচের পঞ্চম গোল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ম্যাচের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে মিউরার সেই ঐতিহাসিক গোলটিই।
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক সক্রিয় পেশাদার ফুটবলার হিসেবে পরিচিত মিউরা ১৯৮৬ সালে পেশাদার ফুটবলে যাত্রা শুরু করেন। এরপর প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি পেশাদার ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জাপানের ফুটবলের বিকাশ ও জনপ্রিয়তার সঙ্গেও তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের ফুটবলপ্রেমীর কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার প্রতীক।
মিউরার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো তাঁর দীর্ঘস্থায়ী খেলার মানসিকতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন অধিকাংশ খেলোয়াড় অবসর নিয়ে কোচিং বা অন্য ভূমিকায় চলে যান, তখনও তিনি মাঠে থাকার পথ বেছে নিয়েছেন। ৫৯ বছর বয়সেও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে তাঁর উপস্থিতি সেই ব্যতিক্রমী অধ্যায়েরই প্রমাণ।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৬০ বছরে পা দেবেন মিউরা। তার আগেই নতুন ক্লাবের হয়ে গোল করে তিনি নিজের বর্ণিল ক্যারিয়ারে যোগ করলেন আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
এই জয়ের ফলে ফুকুশিমা ইউনাইটেড আগামী ১৯ আগস্ট থেকে শুরু হতে যাওয়া এম্পেররস কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। দলটির জন্য এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য, তেমনি মিউরার জন্যও দিনটি হয়ে থাকল বিশেষ এক মাইলফলক।
৫৯ বছর বয়সে তাঁর গোলটি শুধু একটি ম্যাচের স্কোরলাইন বদলায়নি; বরং আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা, পেশাদারিত্ব এবং মাঠে থাকার অদম্য ইচ্ছা থাকলে বয়স সব সময় সীমারেখা হয়ে দাঁড়ায় না। ‘কিং কাজু’ তাই আরও একবার প্রমাণ করলেন, ইতিহাস গড়ার ক্ষুধা এখনও তাঁর মধ্যে আগের মতোই তীব্র।
মন্তব্য