সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্যুতি ঘটে তখনই, যখন শোষক ও শোষিতের বস্তুগত পরিচয় বিচারে ‘শ্রেণি’ (Class) ক্যাটাগরিকে সড়িয়ে সেখানে ‘সম্প্রদায়’ (Community) ক্যাটাগারিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। মার্কসীয় ও সেক্যুলার ইতিহাসপাঠের মূল ভিত্তি হলো—উৎপাদন সম্পর্ক ও ভূ-সম্পত্তি ব্যবস্থার কাঠামোর কারণে সমাজ বিভাজিত হয় শোষক ও শোষিত শ্রেণিতে। সামন্তবাদে এই বিভাজন ছিল ‘জমিদার/জোতদার বনাম প্রজা/কৃষক’; আর পুঁজিবাদে তা ‘পুঁজিবতি বনাম শ্রমিক’। সেখানে শোষকের কোনো জাত বা ধর্ম থাকে না; শোষকের একমাত্র ধর্ম হলো তার শ্রেণিস্বার্থ।
আহমদ সফা তাঁর ইতিহাসচর্চায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু মারাত্মক চাতুরির আশ্রয় নিয়েছেন। উনিশ ও বিশ শতকের বাংলায় ব্রিটিশদের তৈরি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক ‘হিন্দু মধ্যবিত্ত’, ‘জমিদার’ বা ‘জোতদার’ শ্রেণির রূপাত্মক অর্থনৈতিক শোষণকে বিশ্লেষণ করার নামে, সফা ধীরে ধীরে সেই শোষণের দায় ঢালাওভাবে পুরো ‘হিন্দু সমাজ’-এর ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এই পর্বের মূল প্রতিপাদ্য হলো: কীভাবে ছফামন ‘শ্রেণি’ থেকে ‘সম্প্রদায়’-এ পিছলে গিয়ে পুরো হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীকে এক অখণ্ড শোষক হিসেবে খাড়া করেছে এবং যৌথ শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাসকে ধূলিসাৎ করেছে।
১. শ্রেণি থেকে সম্প্রদায়: ঐতিহাসিক বাস্তবতার বিপরীতে ছফীয় অপকৌশল
১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে পূর্ব বাংলায় যেসব ভূস্বামী ও জাইগিরদার গড়ে উঠেছিল, তাদের একটি বড় অংশ হিন্দু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্ণের অন্তর্ভুক্ত হলেও, এটি সমাজবিজ্ঞানের একটি আংশিক সত্য। পূর্ণাঙ্গ সত্যটি হলো:
১. নিম্নবর্ণের বিপুল হিন্দু কৃষক সমাজ: পূর্ব বাংলার মোট হিন্দু জনসংখ্যার প্রায় ৬০-৭০% ছিল নমশূদ্র, রাজবংশী, পণ্ড ও নিম্নবর্ণের হিন্দু। তারা কিন্তু জমিদার ছিল না; তারা ছিল মুসলিম কৃষকদের মতোই ভূমিহীন প্রজা, ভাগচাষী ও মারাত্মক শোষণের শিকার।
২. মুসলিম সামন্ত শ্রেণি: ঢাকা ও বগুড়ার নওয়াব পরিবার, জলপাইগুড়ির ও শায়েস্তাবাদের মুসলিম জমিদাররা একইভাবে সাধারণ মুসলিম ও হিন্দু কৃষকদের ওপর নির্মম চাবুক চালাত এবং ব্রিটিশ রাজের আনুগত্য করত।
কিন্তু সফার তাত্ত্বিক ফ্রেমের ভেতর দিয়ে গেলে এই জটিল শ্রেণিগত কাঠামোটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সফা শোষকের শ্রেণি-পরিচয়কে মুছে দিয়ে শোষককে সংজ্ঞায়িত করেন তার ‘ধর্মীয় পরিচয়’ দিয়ে।
“হিন্দু সমাজ সামগ্রিকভাবে বাঙালি মুসলমানকে কোনোদিন আপন বলে গ্রহণ করেনি। হিন্দু মধ্যবিত্ত তার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য রক্ষার জন্য মুসলমান সম্প্রদায়কে শোষণের পাত্র হিসেবেই মনে করে এসেছে। ফলে শোষিত মুসলমানের কাছে হিন্দু পরিচয়টিই হয়ে উঠেছিল শোষকের প্রতিশব্দ।”
- ‘এলিট’ থেকে ‘সমাজ’-এ লাফানো: সফা শুরু করেন ‘হিন্দু মধ্যবিত্ত’ বা ‘জমিদার’ শ্রেণি দিয়ে, কিন্তু শেষ করেন পুরো ‘হিন্দু সমাজ’কে অভিযুক্ত করে। একজন নমশূদ্র ভূমিহীন কৃষকের দারিদ্র্য ও নিগ্রহকে সফা একঝটকায় মুছে দিয়ে তাকেও বানিয়ে দিলেন “মুসলিম প্রজার শোষক”!
- সামাজিক যৌথতার হত্যা: এই ঢালাও সাম্প্রদায়িকীকরণের ফলে এটি প্রতিষ্ঠিত করা হলো যেন কোনো সাধারণ হিন্দু প্রজা কখনোই মুসলিম প্রজার ভাই বা সহযোদ্ধা হতে পারে না; কারণ হিন্দু মাত্রই বংশগতভাবে শোষক এবং মুসলিম মাত্রই জন্মগতভাবে শোষিত।
২. যৌথ প্রজা ও আন্দোলন মুছে ফেলার প্রজেক্ট: তেভাগা ও নাচোলের ইতিহাস বিকৃতি
- পাবনা কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭৩): এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ঈশানচন্দ্র রায় (হিন্দু) এবং শম্ভু পাল ও খুদি মোল্লা (মুসলিম)। তারা যৌথভাবে হিন্দু-মুসলিম জমিদারের অন্যায্য খাজনার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।
- তেভাগা আন্দোলন (১৯৪৬–৪৭) ও নাচোল বিদ্রোহ (১৯৪৯–৫০): তেভাগা আন্দোলনের প্রধান নেতানেত্রীদের অন্যতম ছিলেন ইলা মিত্র (হিন্দু নারী), যিনি সাঁওতাল ও মুসলিম কৃষকদের নিয়ে জোতদার শোষণের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।
[সমাজ বিশ্লেষণের দুই বিপরীত ধারা]
প্রকৃত সেক্যুলার ও বস্তুবাদী পাঠ (শ্রেণি বিশ্লেষণ):
[হিন্দু/মুসলিম জমিদার ও জোতদার শ্রেণি] ──শোষণ করে──> [হিন্দু-মুসলিম-সাঁওতাল প্রজা ও কৃষক]
*ফলাফল:* যৌথ শ্রেণিসংগ্রাম ও কৃষক ঐক্য (তেভাগা, নাচোল)।
ছফীয় পরিচায়িত পাঠ (ছফামন):
[অখণ্ড 'হিন্দু সমাজ'] ──শোষণ করে──> [অখণ্ড 'মুসলিম সমাজ']
*ফলাফল:* শ্রেণিসংগ্রাম বিলোপ, ধর্মীয় ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি।
“বাংলায় বামপন্থীরা যে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছেন, তা ছিল একধরনের অলীক বিলাসিতা। কারণ তারা বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত সামাজিক ক্ষোভকে বুঝতে পারেনি—যা ছিল মূলত বর্ণহিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের লড়াই।”
৩. রাজনৈতিক পরিণতি: শত্রু সম্পত্তি আইন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধায়ন
যখন কোনো চিন্তক একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে শেখান যে—”প্রতিবেশী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষও মূলত ঐতিহাসিক শোষক শ্রেণির অংশ”—তখন সেই সমাজে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ভূমি দখলের নৈতিক বৈধতা তৈরি হয়।
সফার এই “হিন্দু সমাজ মানেই শোষক” তাত্ত্বিক কাঠামোর রাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী:
১. বাঙালি মুসলিম শোষককে আড়াল: সাধারণ মুসলিম কৃষককে বোঝানো হলো যে, তাদের দারিদ্র্যের জন্য মুসলিম নওয়াব বা উদীয়মান মুসলিম বুর্জোয়া শ্রেণি দায়ী নয়; দায়ী হলো পাশের বাড়ির হিন্দু শিক্ষক বা ছোট ব্যবসায়ী। এর ফলে মুসলিম সমাজের ভেতরের শ্রেণি-শোষণ অলক্ষিত থেকে গেল।
২. সাম্প্রদায়িক ভূমিদখলের মানসিক ভিত্তি: ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান সরকারের কুখ্যাত ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ (Vested Property Act) এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জমি ও ভিটেমাটি দখলের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার পেছনে মানসিক জাস্টিফায়ার হিসেবে কাজ করেছে এই ছফীয় যুক্তি। দখলকারীরা মনে করার সুযোগ পেয়েছে যে—“হিন্দুদের সম্পদ দখল করা কোনো অপরাধ নয়, এটি অতীত শোষণের বিপরীতে একধরনের ঐতিহাসিক পাওনা আদায়!”
৪. প্রগতির আড়ালে ডানপন্থী সাম্প্রদায়িকতার কারখানা
আহমদ সফা নিজেকে মার্কসবাদের পাঠক বলে দাবি করলেও, তিনি মূল মার্কসবাদকে ধূলিসাৎ করে গড়ে তুলেছেন এক কুখ্যাত ‘পপুলিস্ট সাম্প্রদায়িকতা’।
মার্কসবাদের মূল কথা: “দুুনিয়ার মজদুর এক হও” (জাত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে)।
ছফামনের মূল কথা: “বাঙালি মুসলমান এক হও—হিন্দু শোষক সমাজের বিরুদ্ধে।”
এটি কোনো প্রগতিশীল চিন্তা নয়; এটি হলো উগ্র ফ্যাসিবাদের চিরন্তন ব্যাকরণ। হিটলার যেভাবে জার্মানির সমস্ত অর্থনৈতিক সংকটের দায় সাধারণ ইহুদিদের ঘাড়ে চাপিয়ে তাদের ‘একক শোষক’ বানিয়েছিলেন, সফা ঠিক একইভাবে বঙ্গীয় অর্থনীতির সমস্ত ঐতিহাসিক শোষণের দায় ‘ঢালাও হিন্দু সমাজ’-এর ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
‘শ্রেণি’কে ফিরিয়ে আনার আহ্বান
আহমদ সফার ‘হিন্দু সমাজকে একক শোষক বানানোর রাজনীতি’ বাঙালি সমাজকে কোনো মুক্তিসংগ্রামের দিকে নিয়ে যায়নি; বরং তা শ্রেণিসংগ্রামের চেতনায় ছাই চাপা দিয়ে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে ধর্মের নামে বিভক্ত করেছে।
আজকের বাংলাদেশে যদি একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলতে হয়, তবে সফার এই ‘সম্প্রদায়ভিত্তিক ছদ্ম-ইতিহাসপাঠ’কে খণ্ডন করতে হবে। শোষককে শোষক হিসেবে এবং শোষিতকে শোষিত হিসেবে তার ‘শ্রেণিগত অবস্থান’ দিয়ে চিনতে হবে—তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়। ছফামনের এই সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা ছাড়া অসাম্প্রদায়িক নাগরিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা অসম্ভব।







