,

কলকাতা: ঔপনিবেশিক কেন্দ্র, নাকি ‘হিন্দু আধিপত্যের’ প্রতি উগ্র বিদ্বেষ? । ছফামন পর্ব ৭

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে কলকাতা কেবল ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংবাদপত্র, মুদ্রণযন্ত্র এবং আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র প্রধান মহানগর (Colonial Metropolis)। প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর বিচারে পূর্ব বাংলা (অধুনা বাংলাদেশ) ছিল এই কলকাতার কাঁচামাল (বিশেষ করে পাট ও কৃষি সম্পদ) সরবরাহকারী এবং অর্থনৈতিক শোষণের শিকার এক গ্রামীণ অঞ্চল (Hinterland)।

রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সেক্যুলার ইতিহাসপাঠের বিচারে ‘কেন্দ্র বনাম পরিধি’ (Center vs. Periphery)-র এই বৈষম্য ছিল মূলত একটি ঔপনিবেশিক স্থানিক ও অর্থনৈতিক শোষণ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, জীবনানন্দ ও শরৎচন্দ্রের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে প্রমিত রূপ (Standard Colloquial Bengali) গড়ে উঠেছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল এই কলকাতা। কিন্তু আহমদ সফা যখন কলকাতার এই কেন্দ্রিকতার ব্যবচ্ছেদ করতে যান, তখন তিনি স্থানিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বৈজ্ঞানিক ও মার্কসীয় বিশ্লেষণকে রূপ দেন এক উগ্র সাংস্কৃতিক ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে।

ঔপনিবেশিক মেট্রোপলিস হিসেবে কলকাতার ক্ষমতার মেট্রোপলিটন আধিপত্যকে বিশ্লেষণ করার নামে সফা বস্তুত অখণ্ড সার্বজনীন বাংলা সংস্কৃতি, প্রমিত বাংলা ভাষা এবং বাঙালির রেনেসাঁসজাত সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকেই আক্রমণ করেছেন। আর এর মাধ্যমেই তিনি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের আন্দোলনকে রূপান্তর করেছেন উগ্র কলকাতা-বিদ্বেষ তথা অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্তে।

১. মেট্রোপলিটন শোষণ বনাম ছফীয় সাম্প্রদায়িকীকরণ: তত্ত্বের ভয়াবহ বিকৃতি

সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ভূগোল (Economic Geography)-র দৃষ্টিতে মেট্রোপলিস ও হিন্টারল্যান্ডের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা (যেমন: রণজিৎ গুহ বা বদরুদ্দীন উমর) দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটিশ পুঁজিবাদ কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাংলার গ্রামীণ উদ্বৃত্ত শোষণ করত। কিন্তু সফার বিচারে এই কলোনিয়াল পুঁজিবাদী শোষণটি গৌণ হয়ে যায়; প্রধান হয়ে ওঠে ধর্মীয় ও আঞ্চলিক পরিচায়ক দ্বেষ।

সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ ও ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে কলকাতাকে কোনো অর্থনৈতিক চুষক কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং সংজ্ঞায়িত করেছেন এক “উচ্চবর্ণের হিন্দু দুর্গ” হিসেবে—যা নাকি কেবলই মুসলিম জনসংখ্যাকে সাংস্কৃতিক দাসত্বের নিচে চেপে রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল।

সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন:

“কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোনোদিন পুরো বাংলা বা বাঙালি মুসলমানকে প্রতিনিধিত্ব করেনি। কলকাতা ছিল এমন এক সুসংগঠিত বর্ণহিন্দু আধিপত্যের কেন্দ্র, যা ঢাকার মতো অনুন্নত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাকে কেবল শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তাদের ওপর নিজেদের সুবিধামতো এক কৃত্রিম ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য আরোপ করেছে।”
এই যুক্তির ভেতরের মারাত্মক তাত্ত্বিক রাজনীতি খেয়াল করা প্রয়োজন:
  • শোষণের ধরণ বিকৃতি: কলকাতার বাবু ও ভূস্বামীদের শোষণের ভিত্তি ছিল ‘ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ’। কিন্তু সফা শোষকের সেই কলোনিয়াল পরিচয় আড়াল করে কেবল তার ‘হিন্দু ও কলকাতাইয়া’ পরিচয়টি ফুটিয়ে তুললেন।
  • সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবাদ: এর মাধ্যমে সফা প্রচার করলেন যে, কলকাতায় বসে রচিত রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের প্রমিত সাহিত্য নাকি ঢাকা বা পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য “অন্যের সংস্কৃতি” (Alien Culture)!

২. প্রমিত বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দু আধিপত্য’ আখ্যা দেওয়ার চক্রান্ত

বাংলা ভাষার প্রমিতকরণ (Standardization) ঘটেছিল ১৯ ও ২০ শতকের কলকাতায়। প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজ পত্র’ (১৯১৪) এবং রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে যে চলিত ভাষা বাংলা সাহিত্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠল, তা সমগ্র বঙ্গভূখণ্ডের সাধারণ ভাষাভাষীদের যোগাযোগ ও জ্ঞানচর্চার প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করেছিল।

কিন্তু ছফামন এই প্রমিত বাংলা ভাষাকেও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। সফার যুক্তি অনুযায়ী, এই প্রমিত বাংলা ভাষা হলো “কলকাতার হিন্দু বাবুদের কৃত্রিম ভাষা”, যা পূর্ব বাংলার মুসলিম অধিবাসীদের নিজস্ব ভাষা নয়।

[মেট্রোপলিটন বনাম ছফীয় অ্যান্টি-কলকাতা আঞ্চলিক মডেল]

বস্তুবাদী ও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি (প্রগতিশীল পাঠ):
  [কলকাতা (ঔপনিবেশিক কেন্দ্র)] ──অর্থনৈতিক শোষণ──> [পূর্ব বাংলা (কৃষিভিত্তিক পরিধি)]
  *সমাধান:* আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করা, কেন্দ্রভিত্তিক শক্তির বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রমিত প্রগতিশীল ভাষাসংস্কৃতির সার্বজনীন বিকাশ।

ছফীয় পরিচায়িত দৃষ্টিভঙ্গি (ছফামন):
  [কলকাতা (হিন্দু সাংস্কৃতিক দুর্গ)] ──সাংস্কৃতিক আধিপত্য──> [পূর্ব বাংলা (মুসলিম জনপদ)]
  *সমাধান:* প্রমিত বাংলা সংস্কৃতি বর্জন, অখণ্ড বাঙালি পরিচয় খণ্ডন এবং উগ্র আঞ্চলিক-ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ প্রতিষ্ঠা।
সফা লিখছেন:
“কলকাতার পণ্ডিতেরা যে প্রমিত বাংলা ভাষার চাদর আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন, তার সাথে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষার কোনো সংযোগ ছিল না। এটি ছিল মূলত একধরনের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, যার মাধ্যমে পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্যিক সম্ভাবনাকে চেপে রাখা হয়েছে।”

এই বিশ্লেষণের ফলে কী ঘটল?

১. প্রমিত বাংলা ভাষাকে সেক্যুলার সাহিত্যচর্চার মাধ্যম হিসেবে দেখার বদলে তাকে “কলকাতা ও হিন্দুদের ভাষা” বলে সন্দেহ করার একটি মানসিকতা গড়ে উঠল।

২. আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও আন্তর্জাতিক সাহিত্যের সমকক্ষ হওয়ার বদলে পূর্ব বাংলার মানুষকে উগ্র আঞ্চলিকতাবাদ ও সাম্প্রদায়িক ব্যাকরণের খোলে বন্দী করার সাফাই দেওয়া হলো।

৩. অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিকে দ্বিধাবিভক্ত করার ‘দ্বিজাতিতাত্ত্বিক’ তাত্ত্বিক ভিত

১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল একটি রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বিভাজন ছিল না; তা ছিল ব্রিটিশ ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোর চালিত দ্বিজাতিতত্ত্বের (Two-Nation Theory) চরম পরিণতি। দেশভাগের পর যেখানে সেক্যুলার ও অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবীদের কাজ ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অখণ্ড সেক্যুলার ভিত্তিকে রক্ষা করা, সেখানে সফা উল্টো দেশভাগের কালচারাল যুক্তিটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দিলেন।

সফা দাবি করলেন যে, কলকাতা ও ঢাকার সাংস্কৃতিক চেতনা কখনোই এক হতে পারে না, কারণ তাদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ আলাদা।

সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে লিখছেন:

“কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা যখন অখণ্ড বাংলা সংস্কৃতির কথা বলেন, তখন তাদের অবচেতনে কাজ করে একধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ। ঢাকা কোনোদিন কলকাতার ছোট ভাই হয়ে থাকবে না; ঢাকার নিজস্ব কেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে কলকাতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে।”
এটি আঞ্চলিক স্বাধিকার আন্দোলন নয়; এটি হলো সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রয়োগ।
  • কলকাতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বর্জন করার অর্থ হলো—রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র ও জীবনানন্দকে “কলকাতার হিন্দু সাহিত্যিক” বলে পর করে দেওয়া।
  • আর এর বিপরীতে “ঢাকার নিজস্ব কেন্দ্র” গড়ে তোলার নামে মূলত এক উগ্র, ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী ও অণু-জাতীয়তাবাদী (Micro-nationalist) মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেম তৈরি করা।

৪. বর্তমান বাংলাদেশে ছফামনের ধ্বংসাত্মক কালচারাল পরিণতি

আজকের বাংলাদেশে অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রসংগীত, প্রমিত বাংলা ভাষা এবং সেক্যুলার সাংস্কৃতিক উদযাপনের বিরুদ্ধে যে বিষাক্ত আক্রমণ চালানো হয়, তার প্রধান রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানি জোগান আহমদ সফা।

  • যখন বাংলাদেশে উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো চিৎকার করে বলে যে—”রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় কবি হতে পারেন না, কারণ তিনি কলকাতার লোক ও হিন্দু”;
  • যখন তারা দাবি করে যে—প্রমিত বাংলা ভাষার বদলে “ইসলামিক/দোভাষী বাংলা” বা আঞ্চলিক বুলিই হলো বাংলাদেশের প্রকৃত জাতীয় ভাষা;
  • এবং যখন তারা “কলকাতা-বিরোধিতা”র নামে আসলে সেক্যুলারিজম, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ভিত্তির ওপর তোপ দাগে—

তখন তারা মূলত আহমদ সফার তৈরি করে দেওয়া এই “কলকাতা-বিদ্বেষী ভিকটিমহুড ফ্রেম”কেই হাতিয়ার বানায়। সফা কলোনিয়াল মেট্রোপলিস বা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শোষণের স্বাস্থ্যকর ও প্রগতিশীল সমাধান দেননি; তিনি আঞ্চলিক বৈষম্যের ক্ষোভকে উসকে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্যের মূল সেতুটি ভেঙে দিয়েছেন।

অখণ্ড সেক্যুলার সংস্কৃতির শত্রু ‘ছফামন’

কলকাতার ঔপনিবেশিক ক্ষমতা ও আঞ্চলিক বৈষম্যের সমালোচনা করা অত্যন্ত যৌক্তিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় কাজ ছিল। কিন্তু সেই সমালোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক সংহতি বৃদ্ধি করা এবং প্রমিত বাংলা সংস্কৃতিকে সাম্যবাদী ও সর্বজনীন করা।

কিন্তু আহমদ সফা সেই আঞ্চলিক ক্ষমতার আন্দোলনের ছদ্মবেশে অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি, প্রমিত ভাষা ও সার্বজনীন মানবিক রেনেসাঁসকে “হিন্দু আধিপত্যের আখড়া” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি কলকাতার ঔপনিবেশিক অবস্থানকে আক্রমণ করতে গিয়ে আসলে সার্বজনীন বাংলা সংস্কৃতির হৃৎপিণ্ডেই আঘাত করেছেন।

সফার এই ‘উগ্র কলকাতা-বিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি’ কোনো বৈপ্লবিক অ্যান্টি-কলোনিয়াল চেতনা নয়; এটি হলো সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্বের এক বিষাক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্বাসন, যা অখণ্ড বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভেঙে তৈরি করেছে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের অন্ধ গহ্বর।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।