উনিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল বাংলা সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা, বিচারবুদ্ধি ও সামাজিক সংস্কারের এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক মোড়। ইউরোপীয় আলোকায়নের (Enlightenment) প্রভাবে রামমোহন রায়, হেনরি ডিরোজিও ও ইয়াং বেঙ্গল গোষ্ঠী, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও চিন্তাগত রূপান্তর ঘটেছিল, তার অনেক বস্তুগত সীমাবদ্ধতা ছিল। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কাঠামোর অধীনে ঘটা এই নবজাগরণ ছিল মূলত নগরকেন্দ্রিক, ঔপনিবেশিক শাসনের অনুগত এবং নবগঠিত হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
সুশোভন সরকার, সুমিত সরকার, বিনয় ঘোষ বা রণজিৎ গুহের মতো প্রখ্যাত সেক্যুলার ও মার্কসবাদী ইতিহাসবিদরা বহু আগেই বঙ্গীয় রেনেসাঁর এই শ্রেণিগত ও কলোনিয়াল সীমাবদ্ধতাকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু আহমদ সফা যখন বঙ্গীয় রেনেসাঁর বিচার করতে যান, তখন তাঁর উদ্দেশ্য রেনেসাঁর শ্রেণিগত বা ঔপনিবেশিক সীমার প্রগতিশীল রূপান্তর উন্মোচন করা ছিল না। সফা পুরো বঙ্গীয় রেনেসাঁকে চিহ্নিত করেছেন এক চরম সাম্প্রদায়িক ‘হিন্দু বর্ণপ্রথার চক্রান্ত’ এবং মুসলিম সমাজকে অবদমিত রাখার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হিসেবে। রেনেসাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলার মূল্যবোধকে কেবল ‘হিন্দুদের বিষয়’ আখ্যা দিয়ে বর্জন করার রাজনৈতিক ছলে সফা কার্যত মুসলিম সমাজকে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা, যুক্তিবাদ ও সেক্যুলার মূল্যবোধ থেকেই বহুদূরে ঠেলে দিয়েছেন।
১. মার্কসীয় শ্রেণি-সমালোচনা বনাম ছফীয় সাম্প্রদায়িকীকরণ
- বস্তুবাদী ও সেক্যুলার সমালোচনা: মার্কসবাদী ইতিহাসচর্চায় দেখানো হয়েছে কীভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবিধাভোগী নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি ঔপনিবেশিক শাসনকে মেনে নিয়েছিল, কীভাবে তারা গ্রামীণ কৃষক সমাজের (যার মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়ই ছিল) থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, এবং কীভাবে রেনেসাঁর পরিধি ছিল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই সমালোচনার লক্ষ্য ছিল রেনেসাঁকে বর্জন করা নয়; বরং তার সীমাবদ্ধতা টপকে অসাম্প্রদায়িক ও শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথ তৈরি করা।
- ছফীয় পরিচায়িত বর্জননীতি: সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ও ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে রেনেসাঁর শ্রেণিগত সমালোচনাকে গায়েব করে তাকে রূপ দিয়েছেন ধর্মীয় শত্রুতার আখ্যান হিসেবে।
“উনিশ শতকের কলকাতার তথাকথিত রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ছিল মূলত বর্ণহিন্দু সমাজের একমুখী বিকাশ। এই বিকাশ বাঙালি মুসলমানের জাতীয় জীবনে কোনো আলোর বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং তাকে আরও বেশি করে সাংস্কৃতিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
২. আধুনিকতার পথিকৃৎদের সাম্প্রদায়িকীকরণ: যুক্তিবাদ ও আধুনিকতার মূল ভিত্তি উপড়ে ফেলা
বঙ্গীয় রেনেসাঁর কেন্দ্রপুরুষেরা যুদ্ধ করেছিলেন তৎকালীন সামন্তীয় ও ধর্মীয় অন্ধকারের বিরুদ্ধে। রামমোহন রায় সতীতাহ প্রথার বিরুদ্ধাচরণ ও একেশ্বরবাদী চিন্তার প্রবর্তন করেছিলেন; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কুসংস্কার, বহুবিবাহ ও নারী-পীড়নের বিরুদ্ধে লড়ে বিদ্যাপীঠ নির্মাণ ও প্রমিত বাংলা গদ্যের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। ডিরোজিও ও তাঁর শিষ্যরা ধর্মীয় গোঁড়ামির মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন সর্বপ্রকার কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তাঁদের এই সংস্কারগুলো কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ছিল না; তা ছিল বাংলায় সার্বজনীন আধুনিকতার প্রথম স্ফুলিঙ্গ।
কিন্তু ছফীয় তাত্ত্বিক ফিল্টারের ভেতর দিয়ে গেলে এই মহৎ আন্দোলনগুলো তাদের সার্বজনীন মানবিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সফা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন যেন বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের সংস্কারগুলো ছিল কেবল “হিন্দুদের গোষ্ঠীগত বিষয়”, তাই মুসলিম সমাজের জন্য তার কোনো সর্বজনীন শিক্ষা নেই।
“হিন্দু সমাজ যখন রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু করল, তখন তারা বাঙালি মুসলমানকে সহযাত্রী ভাবেনি। হিন্দু মনস্বীরা বাঙালি মুসলমানকে একটি পৃথক, অপাঙ্কক্তেয় এবং অনগ্রসর গোষ্ঠী হিসেবেই গণ্য করেছেন।”
এখানে সফার ইতিহাসপাঠের চরম দেউলিয়াত্ব প্রকাশিত হয়:
১. ইতিহাসের কালানুক্রমিক সত্যের অপলাপ: বিদ্যাসাগর বা রামমোহনের যুগে মুসলিম সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব ছিল চরম প্রতিক্রিয়াশীল উর্দুপন্থী আশরাফ ও ওয়াহাবি-ফরায়েজি আন্দোলনের নেতাদের হাতে। তাঁরা আধুনিক বিজ্ঞান, প্রমিত বাংলা সাহিত্য ও আধুনিক শিক্ষাকে ‘কাফেরী’ ও ‘ইসলামবিনাশী’ মনে করে সাধারণ মুসলিমদের স্কুল-কলেজ থেকে দূরে রেখেছিলেন। বিদ্যাসাগররা মুসলিম সমাজকে বর্জন করেননি; বরং মুসলিম সমাজের নিজস্ব প্রতিক্রিয়াশীল নেতৃত্বই সে সময় আধুনিকতার দুয়ারে তালা ঝুলিয়েছিল।
২. সাংস্কৃতিক দায়মুক্তির ফাঁদ: সফা রামমোহন বা বিদ্যাসাগরকে কেবল “হিন্দুদের নেতা” বানিয়ে দিয়ে মুসলিম সমাজকে এই বার্তা দিয়েছেন যে—বিদ্যাসাগরের যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা বা ডিরোজিওর মুক্তচিন্তা থেকে আমাদের শেখার কিছু নেই, কারণ এগুলো “আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ নয়”!
[বঙ্গীয় রেনেসাঁ বিচারে ছফীয় দেউলিয়াত্ব]
রেনেসাঁর মৌলিক সামাজিক অর্জন:
[যুক্তিবিদ্যা, বিজ্ঞানমনস্কতা, প্রমিত বাংলা গদ্য, সামন্তীয় কুসংস্কার প্রতিরোধ]
↓
ছফীয় পরিচায়িত ফিল্টার (ছফামন):
"এগুলো বর্ণহিন্দুদের তৈরি প্রজেক্ট, এতে মুসলমানদের কোনো আত্মিক স্থান ছিল না।"
↓
রাজনৈতিক পরিণতি:
আধুনিক সেক্যুলার মূল্যবোধ ও জ্ঞানচর্চাকে 'হিন্দুত্ববাদ' আখ্যা দিয়ে বর্জন
এবং মুসলিম সমাজকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ ও মৌলবাদের খোলে আটকে রাখার অপকৌশল।
৩. আধুনিক সেক্যুলার জ্ঞানচর্চা থেকে মুসলিম সমাজকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল
আহমদ সফার রেনেসাঁ-বিরোধী তাত্ত্বিক কাঠামোর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে সাধারণ বাংলাভাষী মুসলিম জনমানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে। সফা যখন ক্রমাগত প্রচার করেছেন যে বঙ্গীয় রেনেসাঁ ও তৎসংলগ্ন আধুনিক বাংলা সংস্কৃতি ছিল “হিন্দু আধিপত্য ও চক্রান্তের ফল”, তখন তিনি সাধারণ মুসলমানদের মনে আধুনিক সেক্যুলার জ্ঞানচর্চা ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রতি এক গভীর অবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছেন।
একটি সম্প্রদায়কে যখন শেখানো হয় যে—বিজ্ঞান, যুক্তি ও আধুনিক সাহিত্যচর্চার ঐতিহাসিক কেন্দ্রটি ‘অন্য সম্প্রদায়ের তৈরি চক্রান্ত’, তখন সেই সম্প্রদায় আধুনিকতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস হারায়। তারা আধুনিক জ্ঞান অর্জন করার বদলে নিজেদের মধ্যযুগীয় ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সুফি/পুঁথি সাহিত্যের খোলের ভেতর আশ্রয় নেওয়াকেই “বিপ্লবী কাজ” মনে করতে শুরু করে।
সফা নিজেও এই বিচ্ছিন্নতাকে একপ্রকার সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বাঙালি মুসলিমরা আধুনিক রেনেসাঁর ধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যে পৃথক ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক খোলে আত্মগোপন করেছিল, তা নাকি তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য “অনিবার্য” ছিল। এর মাধ্যমে সফা আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষা বর্জন করে উগ্র ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের দিকে হাঁটার প্রতিক্রিয়াশীল পথটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক সাফাই দান করেছেন।
৪. বর্তমান বাংলাদেশে ছফামনের ধ্বংসাত্মক উত্তরাধিকার
আজকের বাংলাদেশে বঙ্গীয় রেনেসাঁ, বিদ্যাসাগর, রামমোহন ও আধুনিক সেক্যুলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যে উগ্র হামলা চালানো হচ্ছে, তার বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ এসেছে আহমদ সফার এই বিষাক্ত যুক্তি থেকে।
- যখন উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী পাঠ্যবই থেকে বিদ্যাসাগর বা রেনেসাঁর লেখকদের রচনা বাদ দেওয়ার দাবি তোলে;
- যখন তারা দাবি করে যে প্রমিত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক রূপটি “হিন্দুয়ানি ও সেক্যুলার চক্রান্ত”;
- এবং যখন তারা যুক্তিবিদ্যা ও আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষার বিপরীতে ধর্মীয় মধ্যযুগীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকেই “বাঙালি মুসলমানদের একমাত্র আসল পরিচিতি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়—
তখন তারা মূলত আহমদ সফার তৈরি করা এই রেনেসাঁ-বিরোধী ফ্রেমটিকে ব্যবহার করে। সফা রেনেসাঁর শ্রেণিগত সীমাকে অতিক্রম করে সমাজকে আরও বেশি অসাম্প্রদায়িক, বৈজ্ঞানিক ও সাম্যবাদী করার পথ দেখাননি; তিনি রেনেসাঁকে “হিন্দুদের বিষয়” বলে উড়িয়ে দিয়ে সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার চাবিটি তুলে দিয়েছেন উগ্র ডানপন্থীদের হাতে।
প্রগতির প্রচ্ছদে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের তোষণ
বঙ্গীয় রেনেসাঁ নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তা ছিল বাংলার মাটিতে সামন্তীয় কুসংস্কার ধ্বংসের প্রথম প্রধান ঐতিহাসিক সামাজিক পদক্ষেপ। একজন প্রগতিশীল চিন্তকের কাজ হলো রেনেসাঁর সেই আলোকধারাকে সর্বজনীন ও সেক্যুলার রূপ দেওয়া।
কিন্তু আহমদ সফা রেনেসাঁকে কেবল “বর্ণহিন্দু বর্ণপ্রথার চক্রান্ত” বলে উড়িয়ে দিয়ে যৌথ বাঙালি সংস্কৃতির আধুনিক ভিত্তিমূলেই কুঠারঘাত করেছেন। তিনি প্রগতির ভাষা ব্যবহার করে বাঙালি মুসলিমকে সেক্যুলার রেনেসাঁর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন এবং তাদের ঠেলে দিয়েছেন উগ্র পরিচয়বাদ ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারে।







