বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের ইতিহাসে যাঁদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে, তাঁদের অন্যতম উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, গবেষক, সুরকার, স্বরলিপিকার ও শিক্ষক ওস্তাদ সুধীন দাশ। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন এক চলমান সঙ্গীত-প্রতিষ্ঠান। সঙ্গীতের প্রতিটি শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ, আর সেই বিচরণ ছিল জ্ঞান, নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও শুদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৩০ সালের ৩০ এপ্রিল কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা নিশিকান্ত দাশ এবং মাতা হেমপ্রভা দেবীর স্নেহধন্য এই গুণী শিল্পীর সঙ্গীতে হাতেখড়ি বড় ভাই সুরেন দাশের কাছে। পরবর্তীতে তাঁর উৎসাহেই তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম গ্রহণ করেন এবং সঙ্গীতকে আজীবনের সাধনা হিসেবে বেছে নেন।
১৯৪৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় রেডিওতে অডিশনের মাধ্যমে তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা। পরে ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সঙ্গীত পরিচালনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন।
ওস্তাদ সুধীন দাশের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো বাংলা গানের শুদ্ধ স্বরলিপি সংরক্ষণ ও প্রামাণ্য রূপ প্রদান। বিশেষ করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানকে মূল গ্রামোফোন রেকর্ডের বাণী ও সুর অনুসারে সংরক্ষণ ও স্বরলিপিবদ্ধ করার যে মহৎ উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে ১৬ খণ্ড এবং নজরুল একাডেমি থেকে ৫ খণ্ডসহ মোট ২১ খণ্ড নজরুলগীতির স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশ করে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন।
লালনসংগীতের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনিই প্রথম লালনগীতির স্বরলিপি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যা লালনের গানকে শুদ্ধভাবে সংরক্ষণ ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে।
তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ শিক্ষকও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষার পরীক্ষক, বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের গ্রেডেশন বোর্ডের প্রধান বিচারক, বাংলা স্বরলিপি প্রমাণীকরণ পরিষদের সভাপতি এবং দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী আজ বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের গর্ব।
১৯৭০ সালে ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান কালচারাল একাডেমির (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ কালচারাল একাডেমি) অধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং সঙ্গীতচর্চার প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
সঙ্গীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৮ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়াও চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন।
আজ ২৭ জুন, এই মহান সঙ্গীতসাধকের প্রয়াণদিবস। ২০১৭ সালের এই দিনে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, গবেষণা, স্বরলিপি, শিষ্য এবং সঙ্গীতভাবনা আজও বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হয়ে বেঁচে আছে।
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বাংলা সঙ্গীতের এই মহীরুহকে। তাঁর কর্ম, আদর্শ ও সৃষ্টিশীল সাধনা আগামী প্রজন্মকে যুগের পর যুগ আলোকিত করুক।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, ওস্তাদ সুধীন দাশ।









