রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কাঁটাবন এলাকায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত হাসান আরিফের ল’ চেম্বার সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুক্রবার (২৬ জুন) দিবাগত গভীর রাতে আল বারাকা টাওয়ারে ঘটা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চেম্বারে কর্মরত দুই তরুণ কর্মচারী।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট দীর্ঘ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে পুড়ে যায় চেম্বারে থাকা কোটি টাকার মূল্যবান আইনি বই, গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথিপত্র ও আসবাবপত্র। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে দুই তরুণের অকাল মৃত্যু পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।
Table of Contents
বাথরুমে লুকিয়েও শেষ রক্ষা হলো না
নিহত দুই কর্মচারীর নাম আব্দুস সালাম (২০) ও জনি (২৪)। প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে তারা ওই চেম্বারেই রাতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাত ১টার দিকে হঠাৎ পুরো ভবনে আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় এবং বাইরে বের হওয়ার পথ না পেয়ে প্রাণ বাঁচাতে তারা চেম্বারের ভেতরের একটি বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নেন।
সেখানে দরজা বন্ধ করে দিয়েও তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি। আগুনের তীব্র ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস বাথরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে বাথরুমের দরজা ভেঙে তাদের উদ্ধার করেন, ততক্ষণে তাদের শরীরের ভেতরের শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দফতর জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ৫ মিনিটে তারা আল বারাকা টাওয়ারে আগুন লাগার খবর পান। ঘটনার পরপরই প্রথমে লালবাগ ও পরে আশপাশের স্টেশন থেকে একের পর এক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ল’ চেম্বারটিতে বিপুল পরিমাণ বই এবং কাগজপত্র থাকায় আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়।
ফায়ার সার্ভিসের মোট ৬টি ইউনিটের টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময়ের যৌথ প্রচেষ্টায় রাত ৩টা ৮ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর পরপরই শুরু হয় তল্লাশি অভিযান। বাথরুম থেকে অচেতন অবস্থায় সালাম ও জনিকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আব্দুস সালামকে মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, জনিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিহতদের পরিচয় ও শোকের মাতম
নিহত আব্দুস সালাম বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার বড় ভাদাহার গ্রামের মোহাম্মদ সেলিম ও রেহেনা বিবির সন্তান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল নোমানের ব্যক্তিগত সহকারী (ক্লার্ক) হিসেবে কাজ করতেন। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে সালামের পরিবার এখন বাকরুদ্ধ।
অন্য নিহত যুবক জনি কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বাবুন্দিয়া গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে। তিনি সাবেক উপদেষ্টা হাসান আরিফের ছেলে ব্যারিস্টার মোয়াজের সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য ঢাকায় আসা এই দুই তরুণের এমন করুণ মৃত্যুতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
ক্ষয়-ক্ষতি ও তদন্তের সর্বশেষ পরিস্থিতি
ক্ষতিগ্রস্ত ল’ চেম্বারটি দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাসান আরিফের স্মৃতিবিজড়িত অফিস। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে চেম্বারটি পরিচালনা করছিলেন তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার মোয়াজ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ভবনটির অন্য এক আইনজীবীর গানম্যান সরোয়ার জানান, চেম্বারের ভেতরে থাকা লাখ লাখ টাকা মূল্যের দেশি-বিদেশি আইনের বই, নথিপত্র এবং ডিজিটাল ডিভাইস সব পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার মূল কপিও এখানে সংরক্ষিত ছিল, যা আইন পেশার ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি।
নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহিন গণমাধ্যমকে জানান, নিহত দুজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক ধারণায় মনে হচ্ছে ধোঁয়ার কারণে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় শ্বাসরোধে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত ও সুনির্দিষ্ট কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে নাকি অন্য কোনো উৎস থেকে আগুনের সূত্রপাত, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ ও আগুন লাগার সঠিক কারণ জানা যাবে।









