ব্রাজিল জাতীয় দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা যতই বাড়ুক, নিজের পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন না কোচ কার্লো আনচেলত্তি। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলার কাজেই এখন তাঁর মূল মনোযোগ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর ব্রাজিলের ফুটবল অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠলেও তরুণদের সুযোগ দেওয়ার নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে চান না অভিজ্ঞ এই ইতালিয়ান কোচ।
গত শুক্রবার টাউন্সভিলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামে ব্রাজিল। ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হয়। চার দিন পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্রিসবেনের ল্যাং পার্কে আবারও অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে ব্রাজিলের। অস্ট্রেলিয়া সফরের এই দুই ম্যাচের পর আগামী অক্টোবরে ভারতের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে তাদের।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পারফরম্যান্স ব্রাজিলের সমর্থক ও ফুটবল বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশকে হতাশ করেছে। নতুন চক্রের শুরুতেই প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স না আসায় সমালোচনাও হয়েছে বেশ জোরালোভাবে। এর পেছনে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপের হতাশাজনক বিদায়ের প্রভাবও রয়েছে। নরওয়ের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর ব্রাজিলের জাতীয় দলকে ঘিরে সমর্থকদের প্রত্যাশা ও চাপ দুটিই বেড়েছে।
বিশ্বকাপজয়ী সাবেক ব্রাজিলিয়ান তারকা দেনিলসন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দলের পারফরম্যান্সকে ‘অত্যন্ত বাজে বার্তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ধারাভাষ্যকার গালভাও বুয়েনো ম্যাচটিকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। ক্রীড়া সাংবাদিক হোসে ত্রায়ানো আবার আনচেলত্তিকে বরখাস্ত করার দাবিও তুলেছেন। মে মাসে চার বছরের জন্য নতুন চুক্তি সই করা আনচেলত্তির ওপর এমন সমালোচনা বাড়তি চাপ তৈরি করলেও তিনি তা নিজের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে দিতে চান না।
কোয়েন্সল্যান্ডে ব্রাজিল দলকে স্বাগত জানাতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন আনচেলত্তি। তাঁর মতে, জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করলে সমালোচনা থাকবেই। সেই সমালোচনাকে তিনি অস্বাভাবিক কিছু হিসেবে দেখছেন না। তবে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ দল নিয়ে তাঁর যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনার কোনো প্রভাব থাকবে না বলেই জানিয়েছেন তিনি।
আনচেলত্তির পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে তরুণ খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন। অস্ট্রেলিয়া সফরের ২৬ সদস্যের ব্রাজিল দলে ১৭ জন খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা ১০টি বা তার কম। তাদের মধ্যে ১০ জনেরই প্রথম ম্যাচের আগে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয়নি। ফলে বর্তমান সফরটি নতুনদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠেছে।
প্রথম ম্যাচেই তিন তরুণ ফুটবলার ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক করেছেন। নটিংহ্যাম ফরেস্টের জাইর কুনহা, পিএসভির মাউরো জুনিয়র এবং ম্যানচেস্টার সিটির ভিটোর রেইস প্রথমবার জাতীয় দলের জার্সি পরেছেন। আর্থার দিয়াস, গ্যাব্রিয়েল বোন্তেম্পো ও জাইর কুনহার পারফরম্যান্সের প্রশংসাও করেছেন আনচেলত্তি।
কোচের কাছে এই প্রীতি ম্যাচগুলোর গুরুত্ব শুধু ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। তরুণ খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিবেশে সময় দেওয়া, তাদের সামর্থ্য যাচাই করা এবং বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। তাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের ড্রকে তিনি শুধুমাত্র ফলাফল দিয়ে বিচার করছেন না।
আনচেলত্তি অবশ্য দলের পারফরম্যান্সে ঘাটতি ছিল, সেটিও স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ব্রাজিল আরও ভালো ফুটবল খেলতে পারত। তবে একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার পারফরম্যান্সকেও কৃতিত্ব দিয়েছেন তিনি। স্বাগতিকরা ভালো খেলেছে এবং তাদের রক্ষণভাগ বেশ সংগঠিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ব্রাজিল কোচ।
তরুণদের যাচাই করার এই প্রক্রিয়া সামনে আরও চলবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য চূড়ান্ত দল বেছে নেওয়ার আগে খেলোয়াড়দের সম্পর্কে যতটা সম্ভব পরিষ্কার ধারণা নিতে চান আনচেলত্তি। তাঁর লক্ষ্য হলো সম্ভাবনাময় তরুণদের পর্যাপ্ত সুযোগ দিয়ে বোঝা—কারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাপ সামলাতে পারে এবং কারা ভবিষ্যতে জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচটিও ব্রাজিলের জন্য কেবল আরেকটি প্রীতি ম্যাচ নয়। আনচেলত্তির পরিকল্পনায় এটি তরুণদের আরও একবার পরীক্ষা করার সুযোগ। ফলাফল নিয়ে বাইরে যত আলোচনা থাকুক, কোচের মনোযোগ আপাতত ভবিষ্যতের দল গঠনের দিকেই। প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভ্যস্ত করেই ব্রাজিলের পরবর্তী অধ্যায়ের ভিত্তি তৈরি করতে চান তিনি।









