জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

সাভার-আশুলিয়ায় চরম জ্বালানি সংকট: থমকে যাচ্ছে শিল্প উৎপাদন, বাড়ে খরচ

গ্যাসের চাহিদানুযায়ী চাপ না থাকা এবং একটানা লোডশেডিংয়ের কারণে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গুরুতর উৎপাদন সংকট দেখা দিয়েছে। সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকার শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন চালু রাখতে বিপুল পরিমাণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার ফলে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে পরিচালনা ব্যয়। অন্যদিকে পণ্য তৈরি ও সময়মতো জাহাজীকরণে (শিপমেন্ট) চরম বিলম্ব ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গড় সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে আনুমানিক ২৩৭ কোটি ৯৯ লাখ ঘনফুট। বিদ্যুৎ, সার ও অন্যান্য প্রধান ভোক্তা খাতের চাহিদার তুলনায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনেই দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৮৮ কোটি ৩২ লাখ ঘনফুটের বেশি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে রূপান্তর প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে, যার সরাসরি প্রভাব এসে পড়ে শিল্প খাতে।

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর নিয়ন্ত্রণাধীন সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে দিনে গড়ে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এতে শিল্প এলাকাগুলোতে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এর ওপর ডাইং, ওয়াশিং ও টেক্সটাইল কারখানা সচল রাখার জন্য যেখানে ন্যূনতম ৮ থেকে ১০ পিএসআই গ্যাসের চাপের প্রয়োজন, সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই।

শিল্প পুলিশ-১-এর আওতাধীন মোট ১ হাজার ৮৬৩টি ছোট-বড় কারখানার তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, চরম জ্বালানি অসঙ্গতি সত্ত্বেও কোনো কারখানা একবারে বন্ধ হয়নি। তবে বিকল্প উপায়ে ডিজেল জেনারেটর, ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে।

নিচে সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্তমান উৎপাদন পরিস্থিতি ও পরিচালনাগত সংকটের একটি বিস্তারিত তথ্যমালা উপস্থাপন করা হলো:

কারখানার নামখাতের ধরনঅবস্থানস্বাভাবিক উৎপাদনবর্তমান উৎপাদনপরিচালনাগত সমস্যা ও প্রভাব
লিটল স্টার স্পিনিং মিলসুতা উৎপাদনজামগড়া, আশুলিয়াস্বাভাবিক সক্ষমতাসক্ষমতার ৪০%রেশনিং ও বিকল্প শক্তিতে উৎপাদনে প্রতি পাউন্ড সুতায় ১৪-১৫ টাকা অতিরিক্ত খরচ।
এ আর ওয়েট প্রসেসিংওয়াশিং ও ডাইংজিরাবো, আশুলিয়া৪৫-৫০ হাজার পিস/দিন২৫-৩০ হাজার পিস/দিনগ্যাসের চাপ কমে ১-২ পিএসআই হওয়ায় প্রতি ঘণ্টায় বাড়তি ৩০-৩৫ হাজার টাকা ব্যয়।
রিং শাইন টেক্সটাইলটেক্সটাইলডিইপিজেড৩০-৩৫ হাজার টন/দিন৭-১০ হাজার টন/দিনকম চাপের কারণে ভারী যন্ত্রপাতি চালুর পরপরই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
প্রতীক সিরামিকসিরামিকধামরাই৮০ হাজার পিস/দিন২০ হাজার পিস/দিনপ্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় ৭৫% পর্যন্ত উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।
মুন্নু সিরামিকসিরামিকধামরাই২০ হাজার পিস/দিন১০ হাজার পিস/দিনপর্যাপ্ত গ্যাসের চাপে ঘাটতি থাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
প্রীতি কম্পোজিটওয়াশিংজামগড়া, আশুলিয়া৬০ টন/দিন৪০ টন/দিনওয়াশিং প্ল্যান্ট চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থায় ধীরগতিতে কাজ চলছে।
গ্লোবাল আউটার ওয়্যারতৈরি পোশাকসাভার৩০ টন/দিন১১ টন/দিনগ্যাস ও বিদ্যুতের জোড়া ধাক্কায় উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ কমেছে।
আশেয়া ক্লথিংতৈরি পোশাকজামগড়া, আশুলিয়া৮০ হাজার পিস/দিন৫০ হাজার পিস/দিনলোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুতভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
ম্যাক্সকম ইন্ডাস্ট্রিজতৈরি পোশাকহেমায়েতপুর২০ হাজার পিস/দিন৫ হাজার পিস/দিনদৈনিক বিদ্যুৎ ঘাটতির ফলে কারখানাটিতে ৭৫% উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।
ফ্যাশন ফোরামতৈরি পোশাকআশুলিয়া২০ হাজার পিস/দিন৯ হাজার পিস/দিনটানা লোডশেডিংয়ে উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম হচ্ছে।
ফান ফ্যাক্টরিতৈরি পোশাকইউনিক, আশুলিয়াস্বাভাবিক উৎপাদনসীমিত উৎপাদন৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জেনারেটরের পেছনে ডিজেল খরচ তিনগুণ বেড়েছে।

শিল্পাঞ্চল পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-র নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প সম্পূর্ণভাবে চুক্তিভিত্তিক সময়সীমার ওপর নির্ভরশীল। যথাসময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। স্থানীয় গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার কথা বললেও শিল্পমালিকেরা স্থায়ী সমাধানের জোর তাগিদ দিচ্ছেন।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর