২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে পুনর্বীমা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান গ্যালাঘার রি। তাদের সর্বশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সময়ে বৈশ্বিক বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অন্তত ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত দশ বছরের গড় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। একই সঙ্গে এটি সর্বশেষ পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, একই সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বিশ্বব্যাপী মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দশ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ কম। বিশ্লেষকদের মতে, এই তুলনামূলক নিম্ন ক্ষতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ বজ্রঝড় মৌসুম দেরিতে শুরু হওয়া এবং বড় আকারের বহু-বিলিয়ন ডলারের দুর্যোগের অনুপস্থিতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৭টি বড় মাত্রার দুর্যোগ ঘটেছে, যেগুলোর প্রতিটির অর্থনৈতিক ক্ষতি এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। তবে এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি ঘটনা বীমাকৃত ক্ষতির দিক থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
গ্যালাঘার রি জানায়, জানুয়ারির শেষ দিকে উত্তর আমেরিকায় আঘাত হানা ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় ছিল এই প্রান্তিকের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দুর্যোগ। এই ঝড় যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনেরও বেশি অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। ২১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে এই ঝড়ের কারণে বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি আধুনিক ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল শীতকালীন আবহাওয়া ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউরোপের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শক্তিশালী ঝড়ো বাতাসজনিত দুর্যোগ ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ালেও এটি বড় কোনো বীমাকৃত ক্ষতির সীমা অতিক্রম করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র সংবহনজনিত ঝড়—যার মধ্যে টর্নেডো, শিলাবৃষ্টি ও প্রবল বাতাস অন্তর্ভুক্ত—এর কারণে ক্ষতির প্রবণতা ২০০৮ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সময়কালে নয়বার ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং পাঁচবার ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। গত তিন বছর ধরে এই ক্ষতির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করছে, যা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ক্ষতির পেছনে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্মাণ ব্যয়ের বৃদ্ধি, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি, সাধারণ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনবসতির সম্প্রসারণ।
নিচে প্রধান তথ্যগুলো সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—
| সূচক | পরিমাণ | পরিবর্তন |
|---|---|---|
| মোট বীমাকৃত দুর্যোগ ক্ষতি | ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার | দশ বছরের গড়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম |
| মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি | ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার | দশ বছরের গড়ের তুলনায় ১২ শতাংশ কম |
| বড় অর্থনৈতিক দুর্যোগ | ১৭টি ঘটনা | বৈশ্বিক পর্যায়ে |
| বড় বীমাকৃত ক্ষতির ঘটনা | ৫টি ঘটনা | এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি |
| সর্বোচ্চ ক্ষতির ঘটনা | উত্তর আমেরিকার শীতকালীন ঝড় | প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার |
গ্যালাঘার রি-এর প্রধান বিজ্ঞান কর্মকর্তা স্টিভ বোয়েন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র ঝড়জনিত ক্ষতির ধারাবাহিক বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, জলবায়ুর পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনই মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, ঝুঁকি-সচেতন নগর পরিকল্পনা এবং উন্নত বীমা নীতি গ্রহণ না করলে ক্ষতির মাত্রা আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তথ্যকেন্দ্র ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোর দ্রুত বিস্তার নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক দুর্যোগ ক্ষতির প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
