জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

বাংলা কথাসাহিত্যে অস্তিত্বচেতনার পথপ্রদর্শক: কালজয়ী কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

বাংলা কথাসাহিত্যে যে কজন লেখক আধুনিক মানস, অস্তিত্বচেতনা ও গভীর সমাজবাস্তবতাকে প্রাঞ্জল শিল্পরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তিনি সাহিত্যের ক্যানভাসে উপস্থাপন করেছেন গ্রামীণ সমাজের অন্তর্দহন, ধর্মীয় অন্ধতা, কুসংস্কার এবং মানুষের মানসিক জটিলতা। একদিকে তিনি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও নাট্যকার; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্বকারী এক দূরদর্শী কূটনীতিক। পেশাগত সূত্রে জীবনের দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে কাটালেও তাঁর রচনার মূল সুরজুড়ে সব সময়ই স্পন্দিত হয়েছে বাংলার মাটি, মানুষ ও গ্রামীণ সমাজের নানা অসঙ্গতি।

১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলশহরে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। তাঁর বাবা সৈয়দ আহমদউল্লাহ ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বাবার কর্মসূত্রে চাকুরির সূত্রে শৈশব ও কৈশোরে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান তিনি। বিচিত্র সব অঞ্চল আর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখার এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টির প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।

শিক্ষাজীবনেই তাঁর ভেতরের সাহিত্য অনুরাগের স্ফুরণ ঘটে। ফেনী হাইস্কুলে পড়ার সময়ই তিনি সম্পাদনা করেন হাতে লেখা সাহিত্যপত্র ‘ভোরের আলো’। পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’। নামটির মতোই এই গল্পের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর এক উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় আত্মপ্রকাশ ঘটে।

১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ও অমর উপন্যাস ‘লালসালু’। মজিদ চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁকে স্থায়ী আসন এনে দেয়। ধর্মের দোহাই দিয়ে ভণ্ডামি, সমাজকে শোষণের হাতিয়ার বানানো এবং মানুষের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে অস্তিত্ব টিকে রাখার এক নির্মম দলিল এই ‘লালসালু’। পরবর্তীতে এটি ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয় এবং ১৯৬৭ সালে Tree Without Roots নামে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়, যা ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেয়।

পরবর্তীতে তিনি রচনা করেন ‘চাঁদের অমাবস্যা’ (১৯৬৪) এবং ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ (১৯৬৮)। বিশেষ করে এই দুই উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহ রীতি, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও অস্তিত্ববাদের যে অনবদ্য উপস্থাপন তিনি ঘটিয়েছেন, তা বাংলা উপন্যাসকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করে। ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসের একটি উক্তি আজও আমাদের সমাজব্যবস্থাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়—

“তহবিল তছরুপ করেছে এমন অভিযোগে যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না, সে আবার অধার্মিকতার অভিযোগে গভীরভাবে আহত হয়।”

উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প ও নাটকেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সৃষ্টিশীল রূপ দেখা যায়। তাঁর ‘নয়নচারা’ ও ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থদুটিতে ফুটে উঠেছে নিঃসঙ্গতা, ক্ষুধা ও সামাজিক বৈষম্যের জীবন্ত রূপ। নাট্যসাহিত্যে তাঁর সৃষ্টি ‘বহিপীর’, ‘তরঙ্গভঙ্গ’ এবং ‘সুরঙ্গ’ তৎকালীন রৈখিক ধারা থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন নির্মাণশৈলীর পরিচয় দেয়।

দেশের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও ছিল অতুলনীয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ফ্রান্সে অবস্থানরত এই সাহিত্যিক ও কূটনীতিক বিদেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর প্যারিসে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এই মহান কথাসাহিত্যিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্যারিসের উপকণ্ঠে মদোঁ-স্যুর-বেলভ্যুতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন ১৯৫৫ সালে পিইএন (PEN) প্রাইস, ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে আদমজী পুরস্কার এবং ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদক। ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি তাঁর স্মৃতিতে প্রবাসে অবস্থানরত লেখক-সাহিত্যিকদের জন্য ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার’ চালু করে।

আজও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্য আমাদের শুধু গল্প শোনায় না, বরং নিজেদের মনোজগতের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সময়ের পরিক্রমায় সমাজ ও প্রেক্ষাপট বদলালেও, মানুষের অস্তিত্ব ও সামাজিক ভণ্ডামির ওপর তাঁর ছাওয়া সেই আলোর ঝলকানি আজও সমানভাবে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত।

Tags :

Ratul

Recent News