হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে টানা তিন দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকায় শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জেলার ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পকারখানার মধ্যে অন্তত দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। বুধবার থেকে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায় এবং অনেক কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের এই সংকট প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ক্ষতির কারণ হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় শুধু কারখানার আয় কমছে না, রপ্তানি কার্যক্রম, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সরবরাহব্যবস্থাও চাপে পড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ বারবার ওঠানামা করায় মূল্যবান মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করেন। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। আবার কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকদের হাজিরা রাখা হলেও উৎপাদন চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সংকট দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় তাঁদের কারখানার মেশিনগুলো বন্ধ রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির একটি উৎপাদন লাইনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৭ ঘনমিটার এবং অন্য লাইনে ৮৬ হাজার ২৮ ঘনমিটার। কিন্তু টানা তিন দিন ধরে কোনো লাইনেই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘ সময় মেশিন বন্ধ থাকলে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, তাঁদের কারখানায় মাসে প্রায় ১০ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ ঘনমিটার। শুক্রবার সকালে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও পরিস্থিতি দ্রুত আবার খারাপ হয়ে যায়। সকালে সরবরাহ প্রায় ৬০ শতাংশ থাকলেও দুপুর ১২টার দিকে তা কমে প্রায় ২০ শতাংশে নেমে আসে। এত কম চাপের গ্যাসে স্বাভাবিকভাবে মেশিন চালানো সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক শিল্পযন্ত্র হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া কিংবা গ্যাসের চাপের বড় ধরনের ওঠানামার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব যন্ত্রের কিছু নষ্ট হলে সেগুলো মেরামত করাও সহজ নয়। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকার সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আবুল বাশারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে রপ্তানি কার্যক্রমেও পড়তে শুরু করেছে। রপ্তানি প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের অর্ডার বাতিল হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। শিল্পে কর্মরত দেড় লাখ মানুষের আয়-রোজগারের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের জীবিকাও যুক্ত। ফলে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের প্রভাব কারখানার সীমানা পেরিয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
বিশেষ করে সুতা, কাপড় ও পোশাকের মতো পরস্পরনির্ভর শিল্পে একটি অংশের উৎপাদন বন্ধ হলে অন্য অংশও সমস্যায় পড়ে। কাঁচামাল সরবরাহ, পণ্য প্রস্তুত, পরিবহন এবং রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব তৈরি হতে পারে।
সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, শুক্রবার তাঁদের কারখানায় একেবারেই গ্যাস ছিল না। তবে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়নি। গ্যাস সরবরাহ ফিরলে যাতে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা যায়, সে জন্য কর্মীদের কর্মস্থলে রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, গ্যাসের সরবরাহ বারবার বন্ধ ও চালু হলে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর চাপ পড়ে। কিছু যন্ত্র নষ্ট হলে সেগুলো মেরামত করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
শ্রমিকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিক উৎপাদন হচ্ছিল না। এখন সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় কাজও বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে আয়-রোজগার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
নারী কর্মচারী শেফালী বেগমের কথাতেও একই উদ্বেগের প্রতিফলন পাওয়া যায়। তাঁর ভাষ্য, দৈনিক কাজের আয়ের ওপর তাঁদের সংসারের ব্যয় অনেকাংশে নির্ভরশীল। কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে কাজের সুযোগ কমে যায়, একই সঙ্গে আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। সংকট কতদিন চলবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় শ্রমিকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে।
স্থানীয় শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও শ্রমিক-কর্মচারীদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন ইউনিটে নেমে এসেছে নীরবতা। আবার কিছু কারখানায় শ্রমিকদের উপস্থিতি থাকলেও গ্যাসের অভাবে মেশিন চালানো যাচ্ছে না। ফলে কর্মঘণ্টা পার হলেও অনেক শ্রমিককে কার্যত অপেক্ষা করে সময় কাটাতে হচ্ছে।
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে—এমন কথা শোনা গেলেও এ বিষয়ে তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, গ্যাস বিতরণে তাঁদের দায়িত্ব থাকলেও সামগ্রিক সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণ তাঁদের একক সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ পেট্রোবাংলার অধীনে।
হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার সমস্যা শুরু হয়েছিল প্রায় ২০ দিন আগে। প্রথম দিকে কম চাপের কারণে উৎপাদনের গতি কমে যায়। পরে বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট তীব্র আকার নেয়। বর্তমানে দেড় শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা। তাঁদের আশঙ্কা, সংকট যত দীর্ঘ হবে, ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ হারানো, যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় চাপ—সব মিলিয়ে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
হবিগঞ্জের শিল্পখাত তাই দ্রুত ও স্থিতিশীল গ্যাস সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস ফিরলেই সমস্যার সমাধান হবে না; শিল্পকারখানাগুলোকে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত চাপের সরবরাহ। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।









