জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

শিক্ষক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিতর্কের মধ্যেই রংপুরের পুলিশ কমিশনার মাবুদকে অপসারণ

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দম্পতিসহ তাঁদের দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে চারদিকে তীব্র সমালোচনার ঝড় ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (আরপিএমপি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে এই পদ থেকে বদলি করা হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ডিআইজি মু. মাহবুবুর রশীদকে নতুন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তৌছিফ আহমেদ স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে আরও দুজন পুলিশ কর্মকর্তার বদলির আদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আসলাম উদ্দিনকে পুলিশ সদর দপ্তরে টিআর পদে এবং নোয়াখালী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নূরুল আমীনকে খাগড়াছড়ি এপিবিএন ও বিশেষায়িত ট্রেনিং সেন্টারে বদলি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এই প্রশাসনিক রদবদলটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন শিক্ষক পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড এবং তার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
গত ২৩ আগস্ট রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিক তদন্তের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, এই ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। পুলিশের দাবি ছিল, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে এবং মূল অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস প্রথমে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে এবং পরে পরিবারের বাকি সদস্যদের হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্বর্ণালংকার লুট করে।
তবে পুলিশের এই প্রাথমিক বিবৃতির পর থেকেই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ও তথ্যপ্রমাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার আগে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ময়নাতদন্তে সহযোগিতাকারী এক ডোমের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। ওই ভিডিওতে ডোম দাবি করেন যে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত থাকার কথা তিনি শুনেছেন এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে যেন তার বক্তব্যের অমিল না হয়, সে বিষয়েও ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
যদিও ফরেনসিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ডোমের মৌখিক বা অপ্রমাণিত বক্তব্যের ভিত্তিতে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। এ ধরনের সংবেদনশীল অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হলে পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ডিএনএ profiling এবং বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট মতামতের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানিয়েছিলেন যে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে এবং আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে যাওয়ার যে তথ্য পুলিশ প্রাথমিকভাবে প্রচার করেছিল, ময়নাতদন্তে তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। পুলিশি বয়ান ও চিকিৎসকের বক্তব্যের এই অসঙ্গতি তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ বা কারণ নিয়েও পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যার বাইরে ভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন নিহত পরিবারের স্বজনরা। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার তত্ত্বের পাশাপাশি বাড়ি নির্মাণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে চাঁদা দাবির বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে সবমিলিয়ে শিক্ষক পরিবার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া এখন এক জটিল ও বিতর্কিত মোড় নিয়েছে। মামলার তদন্তভার ইতিমধ্যে থানা-পুলিশ থেকে গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হলেও জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করতে এবং সঠিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক প্রতিবেদন ও নিরপেক্ষ তদন্তের বিকল্প নেই।
Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর