রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যার আগে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্য এবং ময়নাতদন্তের সহকারীর মন্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল দেখা গেছে।
একাত্তর টেলিভিশনের একটি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনে ময়নাতদন্তে সহযোগিতাকারী ডোমের বক্তব্যে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়ার ইঙ্গিত উঠে আসে। কথোপকথনে ওই ডোম দাবি করেন, আগামী চক্রবর্তীর যোনিপথ থেকে বীর্য পাওয়ার বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে মরদেহ দেখেই তিনি অনেক কিছু অনুমান করতে পারেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে, চিকিৎসকের আনুষ্ঠানিক রিপোর্টে যা উল্লেখ থাকবে, সিদ্ধান্ত সে অনুযায়ীই হবে। ঢাকার একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতির কথাও জানান তিনি।
ডোমের এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরই পুলিশের তদন্তের গতিপথ ও আগের দেওয়া বয়ান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো ডোমের মৌখিক মন্তব্যই চূড়ান্ত বা ফরেনসিক প্রমাণ হতে পারে না। ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিশ্চিতের জন্য ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট, সংগৃহীত নমুনার ডিএনএ ও প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত আবশ্যক।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও অমিল
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক তথ্যে ধর্ষণের কোনো উল্লেখ ছিল না। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সূচনা। সন্দেহভাজন দুই আসামি—মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে এবং পরে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী ও ছেলে আয়ুশকে একে একে হত্যা করে।
পুলিশ আরও জানিয়েছিল, হত্যার পর অভিযুক্তরা স্বর্ণালংকার লুট করে এবং আলামত গোপন করতে ঘর এলোমেলো করে রাখে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। বর্তমানে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে পুলিশের তদন্ত বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অমিল পাওয়া গেছে।
- চোয়াল ভাঙার দাবি: পুলিশ দাবি করেছিল, আগামী চক্রবর্তীর মুখে ও গলায় শক্ত করে রশি পেঁচানোর ফলে তাঁর চোখ বেরিয়ে আসে এবং চিবুক বা চোয়াল ভেঙে যায়। অথচ ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে হলেও আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙার কোনো চিকিৎসাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
- তরল পদার্থের উৎস: মরদেহের মুখের কাছে দেখা যাওয়া তরল নিয়ে যে রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহারের সন্দেহ উঠেছিল, সেটি চিকিৎসকের মতে পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াজাত তরল হতে পারে।
- হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ: ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার যে কারণ পুলিশ উল্লেখ করেছে, নিহত পরিবারের স্বজনরা তা পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাঁদের দাবি, নতুন বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে চাঁদা দাবির পুরনো বিরোধ থেকেও এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
ময়নাতদন্তে সংগৃহীত নমুনা এবং ফরেনসিক ল্যাবের চূড়ান্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত আগামী চক্রবর্তীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে আলামত ও মৃত্যুর বিবরণ নিয়ে পুলিশের বয়ান এবং চিকিৎসকের মতের যে অমিল দৃশ্যমান হয়েছে, তা উন্মোচনে এখন ফরেনসিক প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে আছে সবাই।









