১৮ শতক ও ১৯ শতকের শুরুতে বিকাশ লাভ করা দোভাষী বাংলা বা পুঁথিসাহিত্য এবং বাংলার গ্রামীণ মরমি লোকসংস্কৃতি (যেমন: বাউল, জারি, সারি, মারফতি) ছিল এই ভূখণ্ডের কৃষিভিত্তিক সমাজের এক স্বাভাবিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং মিশ্র (Syncretic) সাংস্কৃতিক প্রকাশ। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মনসুর উদ্দীন, ড. মুহম্মদ এনামুল হক এবং কবি জসীমউদ্দীনের মতো গবেষকরা আমৃত্যু পরিশ্রম করে এই অবহেলিত পুঁথিসাহিত্য ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে উদ্ধার করেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক সেক্যুলার অখণ্ড বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে এই গ্রামীণ লোকজ ধারাকে যুক্ত করে যৌথ বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি বহুমাত্রিক ও সর্বজনীন করা।
কিন্তু আহমদ সফা যখন পুঁথিসাহিত্য এবং লোকায়ত সংস্কৃতির পুনর্ব্যাখ্যায় হাত দেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক প্রজেক্ট প্রগতিশীল সমন্বয়ের বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয়। সফা অবহেলিত লোকায়ত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রচ্ছদে বস্তুত এমন এক উগ্র স্বাতন্ত্র্যবাদী ‘মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর’ (Muslim Cultural Enclave) নির্মাণ করেছেন, যা সরাসরি আধুনিক সেক্যুলারবাদ, যুক্তিবাদ এবং অসাম্প্রদায়িক অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতিকে বর্জন করে। এই পর্বের মূল অন্বেষণ হলো: পুঁথিচর্চা ও লোকঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কীভাবে ছফামন বাঙালি মুসলিম সমাজকে আধুনিক সাহিত্য ও বিজ্ঞানচেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্বের’ এক নতুন বিষাক্ত ফ্রেম তৈরি করেছে।
১. দোভাষী বাংলা ও পুঁথিসাহিত্যের ঐতিহাসিক সত্য বনাম ছফীয় তাত্ত্বিক বিকৃতি
ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে (যেমন: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বা সুকুমার সেনের গবেষণা) ১৮-১৯ শতকের দোভাষী বাংলা ছিল আরবি, ফারসি, তুর্কি এবং স্থানীয় কথ্য বাংলার এক স্বাভাবিক মিশ্রণ। এই ভাষায় কেবল মুসলিম পুঁথিকাররা (যেমন: সৈয়দ হামজা, গরিবুল্লাহ) নন, ক্ষেত্রবিশেষে অমুসলিম কবিরাও সাহিত্য রচনা করেছেন। এর মূল চালিকাশক্তি ছিল গ্রামীণ অধিবাসীদের মৌখিক বিনোদন ও যৌথ সামাজিক বাস্তবতা।
“দোভাষী বাংলায় রচিত পুঁথিসাহিত্যই হলো বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তার প্রথম স্বাধীন রূপায়ণ। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা যে সংস্কৃতঘেঁষা গদ্য তৈরি করেছিলেন, তা ছিল মূলত বর্ণহিন্দুদের ভাষা। এর বিপরীতে দোভাষী পুঁথি ছিল মুসলমানের নিজস্ব পরিচয় ও ঈমান রক্ষার এক অপরাজেয় দুর্গ।”
- ভাষার সাম্প্রদায়িকীকরণ: সফা আধুনিক প্রমিত বাংলা গদ্যকে (যা বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী নির্মাণ করেছিলেন) “হিন্দুদের তৈরি কৃত্রিম ভাষা” বলে উড়িয়ে দিলেন এবং দোভাষী পুঁথির মিশ্র ভাষাকে “বাঙালি মুসলিমের একমাত্র নিজস্ব ভাষা” হিসেবে ঘোষণা করলেন।
- সমন্বিত ইতিহাস ঢাকা: আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ হাজার হাজার পুঁথি সংগ্রহ করে প্রমাণ করেছিলেন যে বাঙালি মুসলিম কবিরা মহাভারত, রামায়ণ ও নাথ সাহিত্য অনুবাদ করে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির সেতু তৈরি করেছিলেন। অথচ সফা সাহিত্যবিশারদের সেই সমন্বয়বাদী আবিষ্কারকে বিকৃত করে পুঁথিকে বানালেন “হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের প্রতিরোধক দুর্গ”!
২. লোকায়ত সংস্কৃতির ‘মিশ্র’ (Syncretic) ভিত্তি মুছে ফেলার অপকৌশল
বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির প্রধান শক্তি ছিল এর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মহীনতা। লালন শাহ, হাছন রাজা, পাগল কানাই বা গগন হরকরা যে দেহতত্ত্ব ও মরমি দর্শনের চর্চা করেছিলেন, তা বৈষ্ণব তত্ত্ব ও সুফিবাদের অসাম্প্রদায়িক মিশেল।
কিন্তু সফা লোকায়ত সংস্কৃতিকে এই অসাম্প্রদায়িক মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ‘স্বাতন্ত্র্যবাদী অস্ত্র’ হিসেবে রি-প্যাকেজিং করেছেন।
[লোকায়ত ঐতিহ্য বিচারে দুই বিপরীত তাত্ত্বিক মডেল]
প্রগতিশীল সেক্যুলার মডেল (আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ / জসীমউদ্দীন):
[পুঁথি ও লোকায়ত ঐতিহ্য] ──সমন্বিত হয়──> [আধুনিক প্রমিত সেক্যুলার সাহিত্য ও যৌথ অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি]
*ফলাফল:* যৌথ বাঙালি সত্তার বৈচিত্র্যময় সমৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়।
ছফীয় পরিচায়িত মডেল (ছফামন):
[পুঁথি ও লোকায়ত ঐতিহ্য] ──ব্যবহার হয়──> [আধুনিক সেক্যুলার সাহিত্য ও যুক্তিবাদ বর্জনে]
*ফলাফল:* 'সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব' প্রতিষ্ঠা ও উগ্র মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী গহ্বর তৈরি।
“কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক সাহিত্য ও রেনেসাঁ বাঙালি মুসলমানের মনকে ছুঁতে পারেনি, কারণ তার ভিত্তি ছিল বর্ণহিন্দু ঐতিহ্যে। বাঙালি মুসলমান নিজের অজান্তেই তার লোকায়ত মরমি গান, পুঁথিসাহিত্য এবং সুফি ঐতিহ্যের ভেতরে নিজের খাঁটি পরিচয়কে টিকিয়ে রেখেছিল।”
এখানে সফার উদ্দেশ্য পরিষ্কার: তিনি লোকায়ত সংস্কৃতিকে আধুনিক সেক্যুলার শিক্ষার সঙ্গে মেলাতে চাননি; তিনি একে ব্যবহার করেছেন আধুনিক প্রমিত সাহিত্য, যুক্তিবাদ ও আধুনিক বিজ্ঞানচর্চাকে বর্জন করার বাহানা হিসেবে।
৩. ‘সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Cultural Two-Nation Theory)-এর ছফীয় ইশতেহার
১৯৪৭ সালে রাজনৈতিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর অসাম্প্রদায়িক বাঙালির কাজ ছিল সেই রাজনৈতিক বিভাজনকে কাটিয়ে উঠে যৌথ সেক্যুলার সংস্কৃতি পুনর্নির্মাণ করা।
সফা ঠিক এর উল্টো কাজটা করলেন। তিনি রাজনীতির দ্বিজাতিতত্ত্বকে সংস্কৃতির গভীরে নিয়ে গেলেন এবং তৈরি করলেন ‘সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব’।
সফার মতে:
১. হিন্দু ও মুসলিমদের ঐতিহাসিক, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন।
২. আধুনিক সেক্যুলার সাহিত্য চর্চা করা মানে বাঙালি মুসলিমের “নিজের সংস্কৃতিকে বিকিয়ে দেওয়া”।
৩. বাঙালি মুসলিমের মূল অস্তিত্ব নিহিত রয়েছে মধ্যযুগীয় পুঁথি, ধর্মীয় গাথা ও সুফি স্বাতন্ত্র্যের ভেতরে।
এই তাত্ত্বিক ফ্রেমের মাধ্যমে সফা বাঙালি মুসলিমকে শিক্ষা দিলেন যে—রবীন্দ্রসংগীত, প্রমিত বাংলা গদ্য, মঙ্গলকাব্য বা আধুনিক চিত্রকলা অনুশীলন করা তাদের জন্য “পরধর্মীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করার নামান্তর”। এর চেয়ে বড় বিচ্ছিন্নতাবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদ আর কিছু হতে পারে না।
৪. আধুনিকতা বজাত ‘কূপমণ্ডূকতা’: প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতার সাফাই
যে সমাজকে শেখানো হয় যে—তার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে ১৮ শতকের পুঁথিসাহিত্য ও কাসাসুল আম্বিয়ার ভেতরে, সেই সমাজ আধুনিক পৃথিবীর সাথে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারায়।
সফা অবহেলিত পুঁথিসাহিত্যের প্রতি তথাকথিত “দরদ” দেখাতে গিয়ে মূলত মুসলিম সমাজকে এই নৈতিক সুযোগ দিলেন যে:
- তাদের আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শন শেখার প্রয়োজন নেই,
- তাদের ইউরোপীয় আলোকায়ন বা বঙ্গীয় রেনেসাঁর যুক্তিবাদ থেকে শেখার কিছু নেই,
- কারণ তাদের নিজস্ব “পুঁথিভিত্তিক ঐতিহ্য” নাকি সবকিছুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও স্বাবলম্বী!
এটি কোনো সাংস্কৃতিক মুক্তি নয়; এটি হলো একটি সম্প্রদায়কে প্রগতির আলো থেকে বঞ্চিত করে মধ্যযুগীয় গণ্ডির ভেতরে বন্দী করে রাখার প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্ত।
৫. বর্তমান বাংলাদেশে ছফীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের প্রতিক্রিয়াশীল তোষণ
আজকের বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির মূল ভিত্তির ওপর যে উগ্র হামলা চালানো হচ্ছে, তার তাত্ত্বিক রূপকার হলেন আহমদ সফা।
- যখন উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো বৈশাখী মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকজ উৎসব ও সেক্যুলার সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোকে “হিন্দুয়ানি চক্রান্ত” বলে গালি দেয়;
- যখন তারা মূলধারার বাংলা ভাষার প্রমিত রূপকে আক্রমণ করে “দোভাষী/ইসলামিক বাংলা” চালু করার হুঙ্কার ছাড়ে;
- এবং যখন তারা দাবি করে যে—বাঙালি মুসলিমের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত তার ইসলামী-পুঁথিভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য—
তখন তারা মূলত আহমদ সফার তৈরি করে দেওয়া এই “স্বাতন্ত্র্যবাদী পুঁথি সংস্কৃতির ইশতেহার”কেই ব্যবহার করে। সফা ঐতিহ্য উদ্ধারের নামে বস্তুত অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সমন্বয়বাদী মেলবন্ধনের দুয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন।
ঐতিহ্যের ছদ্মবেশে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি
পুঁথিসাহিত্য ও লোকায়ত সংস্কৃতি হলো যৌথ বাঙালি ইতিহাসের এক মূল্যবান ঐতিহাসিক উপাদান। একজন প্রকৃত সেক্যুলার চিন্তকের দায়িত্ব হলো এই উপাদানকে আধুনিক যুক্তিবাদ ও প্রগতির হাতিয়ার বানানো।
কিন্তু আহমদ সফা লোকায়ত সংস্কৃতি ও পুঁথিসাহিত্যকে ব্যবহার করেছেন সেক্যুলারিজম, যুক্তিবাদ ও আধুনিক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে আক্রমণ করার ঢাল হিসেবে। তিনি ঐতিহ্যের পুনরুত্থানের প্রচ্ছদে এমন এক “মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর” নির্মাণ করেছেন, যা বাঙালি মুসলিমকে আধুনিক বিশ্বের জ্ঞানচর্চা ও যৌথ বাঙালি পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক অন্ধ উগ্র পরিচায়িত গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করেছে। সফার এই লোকায়ত সংস্কৃতির পাঠ কোনো সাংস্কৃতিক আত্মআবিষ্কার নয়; তা হলো সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্বের এক কুৎসিত বুদ্ধিবৃত্তিক জয়গান।







