,

‘বাঙালি সংস্কৃতি’ কার? যৌথ উত্তরাধিকার বনাম মুসলিম সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য । ছফামন পর্ব ১১

সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর একচ্ছত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ভূমির খতিয়ান নয়; সংস্কৃতি হলো শতাব্দীপ্রাচীন সহাবস্থান, ভাষিক আদান-প্রদান, উৎপাদন সম্পর্ক এবং লোকায়ত জীবনসংগ্রামের এক সম্মিলিত রূপান্তর (Syncretic Evolution)। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, বাউল-মরমি সঙ্গীত, লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী সৃষ্টিশীলতা—সবই গড়ে উঠেছিল হাজার বছরের যৌথ বাঙালি জীবনের জটিল মিথস্ক্রিয়ায়। সেক্যুলার ও প্রগতিশীল ইতিহাসচর্চার মূল সত্যই হলো: বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস মূলত বিভিন্ন ধর্ম, গোষ্ঠী ও দর্শনের রূপান্তরমূলক সহাবস্থানের ইতিহাস।

কিন্তু আহমদ সফা যখন “বাঙালি সংস্কৃতি কার?”—এই মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হন, তখন তিনি সংস্কৃতির এই ঐতিহাসিক সহাবস্থান ও যৌথতার মূল ভিত্তিমূলে কুঠারঘাত করেন। সফা সেক্যুলার অখণ্ড সংস্কৃতির ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে “বাঙালি সংস্কৃতিতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র ও একচ্ছত্র মালিকানা” দাবি করার প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন খাড়া করেছেন। তিনি সংস্কৃতিকে কোনো যৌথ উত্তরাধিকার হিসেবে না দেখে, তাকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা ‘সার্বভৌম জোনে’ (Sovereign Zones) বিভক্ত করেছেন। এই পর্বের মূল ময়নাতদন্ত হলো: কীভাবে ছফীয় এই সাংস্কৃতিক জোনিং ও ‘স্বতন্ত্র মালিকানার’ রাজনীতি অসাম্প্রদায়িক যৌথ বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে উগ্র ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ ও উগ্র পরিচয়ভিত্তিক ফ্যাসিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পথ প্রশস্ত করেছে।

১. সহাবস্থানের সেক্যুলার ইতিহাস বনাম ছফীয় ‘সাংস্কৃতিক একক অঞ্চল’ (Sovereign Zones)

যেকোনো সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে মিশ্রণ ও গ্রহণের মধ্য দিয়ে। সুফিবাদ ও বৈষ্ণব ধর্মের মেলবন্ধন, মধ্যযুগের শাহ মুহম্মদ সগীর, আলাওল বা ভারতচন্দ্রের সাহিত্যচর্চা থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল—কারো সৃষ্টিকেই কেবল এক সম্প্রদায়ের “একক মালিকানাধীন ঘেরাটোপে” বন্দী করা সম্ভব নয়।

কিন্তু সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ও ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে সংস্কৃতির এই স্বাভাবিক সেক্যুলার বিকাশকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, যেহেতু বাঙালি মুসলিমরা এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী, তাই বাঙালি সংস্কৃতির মূল সংজ্ঞা ও দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হতে হবে তাদের “স্বতন্ত্র ধর্মীয় মনস্তত্ত্ব” দ্বারা।

সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন:

“বাঙালি সংস্কৃতি বলতে এতদিন যে জিনিসটিকে প্রমিত বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা ছিল প্রধানত বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি। কিন্তু বাঙালি বলতে যদি এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, তবে বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান ধারাটি হতে হবে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব জীবনবোধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। এই সংস্কৃতিতে মুসলমানদের মালিকানা কোনো দয়া বা দাক্ষিণ্যের বিষয় নয়, এটি তাদের ঐতিহাসিক অধিকার।”
এই যুক্তির অসাধুতা ও বিপজ্জনক পরিণতি খেয়াল করুন:
  • সংখ্যাগুরুবাদী ফ্যাসিবাদের তোষণ: সফা এখানে ‘সংস্কৃতি’কে গণতন্ত্রের নামে ‘সংখ্যাগুরুবাদ’ (Majoritarianism)-এর হাতিয়ার বানালেন। অর্থাৎ যার জনসংখ্যা বেশি, সংস্কৃতির আধেয় ও রূপায়নে তার “স্বতন্ত্র ধর্মীয় মালিকানা” প্রতিষ্ঠিত হবে!
  • যৌথতাকে ‘অন্যের আধিপত্য’ আখ্যা দান: ভাষা, লোকশিল্প বা আধুনিক সাহিত্যকে যৌথ অসাম্প্রদায়িক সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করার বদলে, সফা সার্বজনীন উপাদানগুলোকে “হিন্দুদের আধিপত্য” এবং তার বিপরীতে এক উগ্র “মুসলিম সাংস্কৃতিক ঘর”কে প্রকৃত জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে খাড়া করলেন।

২. নজরুল ও লালনের প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক বণ্টন

আহমদ সফার ‘সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদী’ প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং লালন সাঁইয়ের মতো অসাম্প্রদায়িক ভাবুকেরা।

(ক) নজরুলের যৌথতা মুছে ‘ইসলামী স্বাতন্ত্র্যের ভাস্কর’ বানানো

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যের চরমতম অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী কণ্ঠ। তিনি একাধারে যেমন লিখেছেন ‘ইসলামের গান’, তেমনই লিখেছেন অমর ‘শ্যামাসঙ্গীত’, ‘কীর্তন’ এবং সোচ্চার হয়েছেন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে (“মোর এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য” কিংবা “জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াতি খেলছ জুয়া”)।

কিন্তু সফা নজরুলকে বিচার করার সময় তাঁর শ্যামাসঙ্গীত, বৈষ্ণব পদাবলী এবং সেক্যুলার বিপ্লবকে একপাশে সরিয়ে রেখে তাঁকে কেবল “মুসলিম সাংস্কৃতিক জাগরণের স্বাতন্ত্র্যবাদী নায়ক” হিসেবে চিত্রায়িত করেন।

সফা লিখছেন:
“নজরুলই প্রথম আধুনিক বাঙালি কবি যিনি বর্ণহিন্দুদের তৈরি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীর ভেঙে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব রূপকল্প, ঐতিহ্য ও আরবি-ফারসি শব্দমালাকে আধুনিক সাহিত্যে সার্বভৌম আসন দিয়েছেন। নজরুল বাঙালি মুসলমানকে তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক মালিকানার বোধ এনে দিয়েছিলেন।”
এখানে সফা নজরুলের সর্বজনীন সাম্যবাদী ও সেক্যুলার বিদ্রোহকে লঘু করে তাঁকে কেবল একটি “নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি” বানিয়ে দিলেন।

(খ) লালনের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদকে ‘মুসলিম সাবঅল্টার্ন প্রতিরোধ’ বানানোর চেষ্টা

লালন শাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন: “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে / লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।” লালনের দর্শন ছিল সর্বপ্রকার প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, জাতপাত ও সাম্প্রদায়িক সীমানার বাইরে মানবধর্মের জয়গান।

কিন্তু সফা লালন ও বাউল ঐতিহ্যকে সেক্যুলার মানবতাবাদী দর্শনের স্তম্ভ হিসেবে না দেখে, তাকে উপস্থাপন করেছেন “উচ্চবর্ণের হিন্দু সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গ্রামীণ মুসলিম প্রজাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ” হিসেবে। সফা লালনের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মহীনতাকে ঢেকে দিয়ে তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ধর্মীয়-আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের রঙ চড়িয়েছেন।

৩. ‘যৌথ উত্তরাধিকার’ ধ্বংসের তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মডেল

সফা বাঙালি সংস্কৃতিকে একটি যৌথ নদীর মতো প্রবাহমান না দেখে, তাকে দুটি আলাদা জলাশয়ে বিভক্ত করেছেন। তাঁর এই বিভাজনের রাজনৈতিক পরিণতি নিচে দেখানো হলো:
                  [বাঙালি সংস্কৃতি বিচারে দুই বিপরীত তাত্ত্বিক অবস্থান]
                                         │
         ┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
         ▼                                                               ▼
[সেক্যুলার ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠ: যৌথ উত্তরাধিকার]                   [ছফীয় পরিচায়িত পাঠ: স্বাতন্ত্র্যবাদী মালিকানা]
• সংস্কৃতি সহাবস্থান ও সমন্বয়ের ফল                             • সংস্কৃতি ধর্মীয় সংখ্যাগুরুত্বের সম্পত্তি
• লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল সবার যৌথ সম্পদ                      • নজরুল/লালনকে কেবল 'মুসলিম জাগরণের' প্রতীক বানানো
• ভাষা ও লোকঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক সেতু                           • সেক্যুলার প্রমিত সংস্কৃতিকে 'হিন্দু আধিপত্য' আখ্যা দেওয়া
*ফলাফল:* অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ               *ফলাফল:* 'সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব' ও ধর্মীয় উগ্রবাদ
সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে সাফ জানিয়ে দেন:
“বাঙালি সংস্কৃতির অখণ্ডতার দাবিটি একটি ভূয়া ধারণা। হিন্দু এবং মুসলমানের ঐতিহাসিক স্মৃতি, ধর্মীয় চেতনা এবং সাংস্কৃতিক উৎস ভিন্ন। এই দুই ভিন্ন ধারাকে জোর করে মেলানোর চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য।”
এটি কোনো প্রগতিশীল সমাজবিশ্লেষণ নয়; এটি হলো সংস্কৃতির ক্ষেত্রে জিন্নাহর ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Two-Nation Theory)-র হুবহু পুনর্বাসন। জিন্নাহ রাজনীতির ক্ষেত্রে দাবি করেছিলেন হিন্দু ও মুসলিম দুটি আলাদা জাতি; আর সফা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দাবি করলেন হিন্দু ও মুসলিমের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা এবং তাদের অখণ্ড যৌথতা অসম্ভব।

৪. বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকটে ‘ছফামন’-এর বিষাক্ত প্রভাব

আজকের বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক জাতীয় জীবন ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির ওপর যে লাগাতার উগ্র আক্রমণ চলছে, তার পেছনে ছফীয় “সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদে”র ভূমিকা অপরিসীম।

  • পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বিরোধিতা: যখন উগ্র ডানপন্থীরা দাবি করে যে, “পহেলা বৈশাখ বা মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের (মুসলিমদের) সংস্কৃতি নয়, এটি হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি”—তখন তারা মূলত আহমদ সফার এই ‘পৃথক সাংস্কৃতিক মালিকানা’র যুক্তিকেই ব্যবহার করে।
  • ভাষিক উগ্রবাদ: প্রমিত বাংলা ভাষাকে “কলকাতার হিন্দু ভাষা” বলে গালি দিয়ে যারা “ইসলামিক বাংলা” বা “দোভাষী ভাষা”র নামে উগ্র সাম্প্রদায়িক শব্দমালা চাপিয়ে দিতে চায়, তারা সফার তৈরি করা ভাষিক স্বাতন্ত্র্যবাদের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
  • সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক অধিকার হরণ: “বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই এদেশের সংস্কৃতি হবে ইসলামী”—এই উগ্র ফ্যাসিবাদী স্লোগানের বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দিয়েছেন আহমদ সফা নিজেই।

যৌথ সংস্কৃতির শত্রুকে চিহ্নিত করার সময়

সংস্কৃতি কোনো একক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ভিটেমাটি নয়। বাংলা ভাষা, লালন, নজরুল, রবীন্দ্র বা লোকায়ত ঐতিহ্য কোনো বিশেষ উপাসনা পদ্ধতির মানুষের সম্পদ নয়; তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা সকল বাংলাভাষী মানুষের যৌথ মেধা ও শ্রমের ফসল।

আহমদ সফা সেক্যুলার সহাবস্থানের এই মহান সত্যকে ধ্বংস করে সংস্কৃতিকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছেন। তিনি “বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির মালিকানা”র নামে আসলে বাঙালি মুসলিমকে বিশ্বজনীন সেক্যুলার মূল্যবোধ ও যৌথ ঐতিহ্যের উষ্ণতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক সংকীর্ণ, উগ্র ও ধর্মান্ধ গহ্বরে নিক্ষেপ করেছেন। অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণের প্রথম শর্তই হলো আহমদ সফার এই ‘সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবাদী বিষবৃক্ষ’কে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপড়ে ফেলা এবং সংস্কৃতির অখণ্ড যৌথ উত্তরাধিকারকে পুনর্দখল করা।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।