,

রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ছফা: সাহিত্যিক স্বাধীনতা নাকি অখণ্ড সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা? । ছফামন পর্ব ৯

আধুনিক বাংলা ভাষা, সাহিত্য, নান্দনিকতা ও সেক্যুলার বাঙালি আত্মপরিচয়ের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১)। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও সামন্তীয় কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিশীলতায় যে মহাজাগতিক, অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন মানবিকতার রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন, তা অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান সেক্যুলার স্তম্ভ। মার্কসবাদী ও ইতিহাস-সচেতন প্রগতিশীল চিন্তকরা (যেমন: ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, সুশোভন সরকার কিংবা বদরুদ্দীন উমর) রবীন্দ্রনাথের সামন্তীয় জমিদারী পটভূমি, শ্রেণিগত পরিধি এবং কলোনিয়াল কাঠামোর সামাজিক সীমাবদ্ধতার বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেছেন।

কিন্তু আহমদ সফা যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবচ্ছেদে নামেন, তখন তাঁর লক্ষ্য কোনো প্রগতিশীল সাহিত্য-সমালোচনা বা ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা ছিল না। সফা রবীন্দ্রনাথকে বারবার উপস্থাপন করেছেন ‘বাঙালি মুসলিম মানসের প্রধান সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ’ এবং ‘বর্ণহিন্দু এলিট আধিপত্যের পরম প্রতীক’ হিসেবে। এই পর্বের মূল অন্বেষণ হলো: রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক বা সামাজিক স্থানিকতার নান্দনিক বিচার না করে কেবল মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদকে প্ররোচিত করতে রবীন্দ্রনাথকে অখণ্ড সেক্যুলার সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার ছফীয় চক্রান্তের ময়নাতদন্ত।

১. বস্তুনিষ্ঠ রবীন্দ্র-পাঠ বনাম ছফীয় সাম্প্রদায়িকীকরণ

রবীন্দ্রনাথকে বিচার করার ক্ষেত্রে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট:
১. বস্তুবাদী ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি: যেখানে রবীন্দ্রনাথের বিশাল সাহিত্যিক অর্জন, প্রমিত বাংলা ভাষার বিকাশ, ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘চতুর্দোলা’ কিংবা ‘মুসলমানীর গল্প’-এ উগ্র ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর অসাম্প্রদায়িক অবস্থানকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। একই সাথে শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে থাকাকালে প্রজা-কৃষকদের জীবনের বস্তুগত সংকট এবং তাঁর প্রবর্তিত কৃষি ব্যাংক ও পল্লী পুনর্গঠন প্রচেষ্টাকে পর্যালোচনা করা হয়।
২. ছফীয় পরিচায়িত বর্জননীতি: যেখানে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সৃষ্টিশীলতাকে একঝটকায় “বর্ণহিন্দু এলিটদের নিজস্ব বিষয়” বলে দাগিয়ে দিয়ে সাধারণ মুসলিমদের মানস থেকে রবীন্দ্রনাথকে উপড়ে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়।
সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ ও ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর “সাংস্কৃতিক শত্রু” বানানোর কৌশল গ্রহণ করেছেন।
সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন:
“রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই সাহিত্যের ভিত্তিভূমিটি ছিল বর্ণহিন্দু অভিজাত সমাজের সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়, তার ধর্মীয় ও সামাজিক সত্তা রবীন্দ্রনাথের বিশাল ক্যানভাসে হয় অনুপস্থিত, না হয় অবজ্ঞাত। ফলে বাঙালি মুসলমান রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধার আসনে রাখলেও তাঁকে নিজের আত্মিক অভিভাবক বলে গ্রহণ করতে পারেনি।”
এই যুক্তির ভেতরের তাত্ত্বিক অসাধুতা গভীর:
  • সার্বজনীন মানবিকতাকে ধর্মীয় ফ্রেমে বাঁধা: রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসে যখন গোরা নিজেকে যেকোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল ‘ভারতীয়’ এবং ‘মানুষ’ হিসেবে ঘোষণা করে, কিংবা রবীন্দ্রনাথ যখন সামন্তীয় হিন্দু গোঁড়ামির তীব্র সমালোচনা করেন—সফা সেই সার্বজনীন সেক্যুলার নান্দনিকতাকে সম্পূর্ণরূপে চেপে যান।
  • বিচ্ছিন্নতাবাদকে তোষণ: সফা এটি প্রতিপন্ন করতে চান যে, যেহেতু রবীন্দ্রনাথ হিন্দু পরিবারে জন্মেছিলেন এবং তাঁর ভাষা উচ্চমার্গীয়, তাই মুসলিম সমাজ তাঁকে বর্জন করে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদের দিকে হাঁটলে তা নাকি একেবারে যৌক্তিক!

২. নান্দনিক সমালোচনা বনাম স্বাতন্ত্র্যবাদী প্রজেক্ট

একজন সাহিত্যসমালোচকের কাজ সাহিত্যের শৈলী, ভাষা, প্রতীক ও রূপকল্পের নান্দনিক দুর্বলতা বা সাফল্য বিচার করা। কিন্তু সফার রবীন্দ্র-বিরোধিতা কোনো নান্দনিক সাহিত্যসমালোচনা ছিল না; তা ছিল এক রাজনৈতিক ‘সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রজেক্ট’ (Cultural Separatist Project)।
[রবীন্দ্র-সমালোচনার দুটি বিপরীত তাত্ত্বিক অবস্থান]

প্রগতিশীল ও বস্তুনিষ্ঠ পাঠ (ধূর্জটিপ্রসাদ / বদরুদ্দীন উমর):
  [সামন্তীয় ভূস্বামী অবস্থান] ──সীমিত করে──> [শ্রেণিগত ও ঔপনিবেশিক পরিধি]
  *নান্দনিক মূল্যায়ন:* সার্বজনীন মানবিকতা, প্রমিত অসাম্প্রদায়িক ভাষা গ্রহণ ও শ্রেণিগত অতিক্রমণ।

ছফীয় পরিচায়িত পাঠ (ছফামন):
  [বর্ণহিন্দু এলিট পরিচয়] ──চিহ্নিত করে──> [মুসলিম সংস্কৃতির প্রধান প্রতিপক্ষ]
  *রাজনৈতিক লক্ষ্য:* অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করা ও উগ্র স্বাতন্ত্র্যবাদ প্রতিষ্ঠা।
সফা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ গ্রন্থে লিখেছেন:
“রবীন্দ্রনাথের অখণ্ড বাংলা সংস্কৃতির ধারণাটি ছিল আসলে কলকাতার বর্ণহিন্দু আধিপত্যের এক সুসূক্ষ্ম রূপ। এই সংস্কৃতির ভেতর বাঙালি মুসলমান নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। সে যখনই নিজের পরিচয় দাবি করেছে, তখনই তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে গালি দেওয়া হয়েছে।”
সফার এই বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মুসলিমদের শেখানো যে—রবীন্দ্রনাথের গান, সাহিত্য বা সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি “আমাদের সংস্কৃতি নয়”। এর মাধ্যমে সফা বাঙালি মুসলিম সমাজকে অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক মানসিক নির্বাসনে পাঠিয়েছেন।

৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্র-বিরোধিতার মিথ্যা পুরাণ (Myth) তোষণ

বাংলাদেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ডানপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর একটি প্রিয় কাল্পনিক গল্প হলো: “রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে কলকাতায় ব্রিগেড/ময়দানে জনসভা করে বিরোধিতা করেছিলেন।” ঐতিহাসিক ও দলিলভিত্তিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দাবির কোনো সত্যতা বা ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। অথচ এই মিথ্যা পুরাণটিকে টিকিয়ে রেখে বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে রবীন্দ্র-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আহমদ সফা এই ঐতিহাসিক সত্যকে বস্তুনিষ্ঠভাবে সামনে এনে মিথ্যা পুরাণটিকে ধ্বংস করার বদলে, নিজের রবীন্দ্র-বিরোধী বয়ান দিয়ে সেই বিদ্বেষের সলতেতেই হাওয়া দিয়েছেন। সফা রবীন্দ্র-প্রতিভাকে স্বীকার করার ভান করেও বারবার দেখিয়েছেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলিমদের রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত উত্থানের প্রতি রবীন্দ্রনাথ বা তাঁর শ্রেণির একটি “অসুয়ামূলক দূরত্ব” ছিল।
এই ধরনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত উগ্র ডানপন্থীদের হাতে এই অস্ত্রটি তুলে দিয়েছে যে: “যেহেতু রবীন্দ্রনাথ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিলেন এবং তিনি বর্ণহিন্দু এলিট, তাই তিনি আমাদের জাতীয় কবি বা সাংস্কৃতিক প্রতীক হতে পারেন না।”

৪. অখণ্ড সংস্কৃতি খণ্ডন ও বর্তমান ‘রবীন্দ্র-বিদ্বেষ’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক তোষণ

আজকের বাংলাদেশে বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তিগুলোর ওপর যে একের পর এক আঘাত আসছে, তার প্রত্যক্ষ বুদ্ধিবৃত্তিক জ্বালানি জোগান আহমদ সফা।
  • যখন উগ্র মৌলবাদী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে যে—”রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হতে পারে না, কারণ তিনি ভারতের এবং হিন্দু কবি”;
  • যখন তারা পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রজয়ন্তী বা প্রমিত বাংলা সাহিত্য চর্চাকে “হিন্দু সংস্কৃতি ও ভারতীয় আধিপত্যের তোষণ” বলে গালি দেয়;
  • এবং যখন তারা সেক্যুলার অখণ্ড বাঙালি পরিচয়ের বিপরীতে এক উগ্র ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী পরিচয় দাঁড় করাতে চায়—
তখন তারা মূলত আহমদ সফার তৈরি করা এই “রবীন্দ্র-বিদ্বেষী স্বাতন্ত্র্যবাদী ফ্রেম”কেই ব্যবহার করে। সফা নিজেকে প্রগতিশীল দাবি করলেও, তিনি অখণ্ড সেক্যুলার বাঙালি সংস্কৃতির সুদৃঢ় স্তম্ভ রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করে বস্তুত ‘সাংস্কৃতিক দ্বিজাতিতত্ত্ব’ (Cultural Two-Nation Theory)-কেই পুনর্বাসিত করেছেন।

স্বাতন্ত্র্যবাদের ফাঁদে সংস্কৃতি হত্যা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনো ঈশ্বর ছিলেন না; তাঁর রচনার সামাজিক সীমানা, শ্রেণিগত অবস্থান ও ঔপনিবেশিক যুগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করা যেকোনো প্রগতিশীল চিন্তার লক্ষণ।
কিন্তু আহমদ সফা রবীন্দ্র-সমালোচনার নামে যে কাজটি করেছেন, তা কোনো সাহিত্যিক স্বাধীনতা নয়; তা হলো অখণ্ড সেক্যুলার সংস্কৃতি থেকে বাঙালি মুসলিমকে বিচ্ছিন্ন করার এক প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক খেলা। সফা রবীন্দ্রনাথকে “বর্ণহিন্দু এলিট” বানিয়ে আসলে বাঙালি মুসলিমকে আধুনিক সেক্যুলার নান্দনিকতা, বিশ্বজনীন মানবিকতা ও যৌথ ভাষার উত্তরাধিকার থেকে এতিম করে দিয়েছেন।
আজ যদি বাঙালি সমাজকে উগ্র মৌলবাদ ও অণু-জাতীয়তাবাদের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে হয়, তবে আহমদ সফার এই ‘রবীন্দ্র-বিদ্বেষী স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনীতি’কে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নস্যাৎ করতে হবে এবং রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন মানবিক উত্তরাধিকারকে পুনর্দখল করতে হবে।
Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।