,

রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পথে বড় অগ্রগতি

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য আনতে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প জাতীয় গ্রিডে নতুন করে সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার পাশাপাশি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।

‘রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প’ শীর্ষক প্রস্তাবটি বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। একনেক চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্যানেল ক্ষমতা হবে ৪৪২ মেগাওয়াট। সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইনভার্টারের মাধ্যমে এসি বিদ্যুতে রূপান্তরের পর জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে।

তাঁর মতে, রামপালে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিবেশবান্ধব উৎসের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে।

নতুন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই

প্রকল্পটির জন্য রামপালের ‘ব্লক-বি’ এলাকায় ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জমি আগেই বিপিডিবি অধিগ্রহণ করে রেখেছে। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, বিদ্যমান জমি ব্যবহারের কারণে প্রকল্পের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও তুলনামূলক সহজ হবে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১২ সালে রামপালে মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল বিপিডিবি। এর মধ্যে ব্লক-এতে ছিল ৯১৫ দশমিক ৫০ একর এবং ব্লক-বিতে ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমি।

ব্লক-এতে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেডের ‘মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ নির্মাণ করা হয়েছে। আর ব্লক-বির জমি বিপিডিবির হাতে রয়েছে।

প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, ব্লক-বি এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিক ভূমি প্রস্তুতির বড় একটি অংশ সম্পন্ন রয়েছে।

বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনেই গ্রিডে যাবে বিদ্যুৎ

রামপাল সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নিতে বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে। কাছেই থাকা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো কাজে লাগানো গেলে নতুন করে বড় ধরনের সঞ্চালন ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন কমবে। এতে প্রকল্পটি তুলনামূলক কম ব্যয়ে এবং দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে।

প্রস্তাবিত কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ৬৪০ ওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল স্থাপন করা হবে। এর পাশাপাশি ৩৬০ মেগাওয়াট মোট ক্ষমতার গ্রিড-টাইড ইনভার্টার, একটি পুলিং সাবস্টেশন, তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-সার্কিট ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন এবং একটি স্পেয়ার বে-সহ তিনটি ২৩০ কেভি বে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প ব্যয়ের অর্ধেক সৌর মডিউলে

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাবে সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল ও মাউন্টিং স্ট্রাকচার কেনায়। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক।

এ ছাড়া ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার ও এসসিএডিএ (SCADA) সিস্টেমসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে নেওয়া ঋণের বার্ষিক সুদের হার হবে ২ শতাংশ। ঋণ পরিশোধে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১৬ বছর সময় পাওয়া যাবে।

পরিকল্পনা কমিশন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে।

২০৩০ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যে অবদান

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে। জাতীয় গ্রিডে নতুন করে ৪৪২ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হবে।

বর্তমানে দেশে অন-গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৮২৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৭৯৭ মেগাওয়াট। রামপাল প্রকল্প যুক্ত হলে গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটবে।

২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি কাঠামোর ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদনের যে লক্ষ্য রয়েছে, প্রকল্পটি তা অর্জনে সহায়ক হবে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।

জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে কমিশন। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়লে প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কার্বন নির্গমন কমাতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্মাণ ও পরিচালনায় কর্মসংস্থান

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রকল্প কার্যালয়ে ২৫ জনের কর্মসংস্থান হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রায় ২০০ জন সাময়িক শ্রমিক কাজের সুযোগ পাবেন।

কেন্দ্রটি নির্মাণের পর এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ২৬১ জনের কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জন স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাবেন এবং ২০৩ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি)। প্রকল্প সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে পেয়েছে।

এদিকে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অননুমোদিত ‘সবুজ পাতা’ প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সুপারিশ এবং পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের সময়সীমা কমানোর সিদ্ধান্তের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগের মূল প্রস্তাবের তুলনায় ব্যয় ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা কমেছে।

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, আর্থিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য। একই সঙ্গে এটি ‘সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামো’র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৭ নম্বর লক্ষ্য—সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করার লক্ষ্য—এর সঙ্গেও প্রকল্পটির সামঞ্জস্য রয়েছে।

একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ এগোলে রামপালের আগে থেকেই অধিগ্রহণ করা জমিতে বড় পরিসরের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠবে। বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ থাকায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ব্যয় ও সময় নিয়ন্ত্রণে রাখারও সম্ভাবনা রয়েছে। জাতীয় গ্রিডে ৪৪২ মেগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতাতেও একটি বড় সংযোজন হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।