,

রি-এনগেজমেন্ট ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন

‘রংধনু জাতি’ গড়তে হলে নানা মত ও পথের মানুষকে সঙ্গে নিতে হবে। কয়েকটি রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের ধারণা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়—অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পালের সাম্প্রতিক একটি মন্তব্যকে ঘিরে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। ৬ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি: বিনিয়োগ বাড়ছেই না কেন’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয়তে তিনি মন্তব্য করেন, রংধনু জাতি তৈরি করতে সাতটি রঙের প্রয়োজন, তিনটি রং দিয়ে তা সম্ভব নয়।

তাঁর বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘তিন রং’ বলতে জামায়াত-বিএনপি-এনসিপিকে বোঝানো হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে এই উপমাকে কেন্দ্র করে একটি বিষয় পরিষ্কার—একটি বহুমাত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রকে কেবল সীমিত রাজনৈতিক পরিসরের মধ্যে রেখে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা কঠিন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘রংধনু জাতি’ ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গোলাপবাগ মাঠের সমাবেশ থেকে বিএনপি তাদের ২৭ দফা ‘রাষ্ট্র মেরামত’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই কর্মসূচির দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশকে ‘রেইনবো নেশন’ বা রংধনু জাতিতে পরিণত করার কথা বলা হয়। এর মাধ্যমে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরা হয়েছিল।

ধারণাটির আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত। বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে দেশটিতে বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষকে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধীনে আনার প্রচেষ্টা চালানো হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মীয় নেতা ও মানবাধিকারকর্মী আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটো ‘রেইনবো নেশন’ ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। পরে ম্যান্ডেলাও দক্ষিণ আফ্রিকাকে এমন একটি সমাজ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, যেখানে বিভিন্ন বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে একই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে থাকবে।

এই ধারণার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর কথাও প্রায়ই উচ্চারিত হয়। বর্ণবাদী শাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্‌ঘাটন এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্মিলনের পথ তৈরি করাই ছিল ওই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে ‘রেইনবো নেশন’ শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; এর সঙ্গে সামাজিক পুনর্মিলন, অতীতের ক্ষত মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রীয় সংহতির একটি বড় প্রক্রিয়াও যুক্ত ছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ধারণা প্রয়োগের প্রশ্নে তাই স্বাভাবিকভাবেই আরও কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক এবং অতীতে রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা দূরে সরে যাওয়া মানুষদের রাষ্ট্র ও অর্থনীতির মূল স্রোতে কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে—তার স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

এখানেই অর্থনীতির প্রসঙ্গটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসা ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা তিন ‘R’-এর ধারণাকে পরিমার্জন করে ড. বিরূপাক্ষ পাল ‘রিভিশন, রিফর্ম ও রি-এনগেজমেন্ট’-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই তিনটির মধ্যে ‘রি-এনগেজমেন্ট’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ শুধু নীতিমালা, সুদের হার বা সরকারি প্রণোদনার ওপর নির্ভর করে না। উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা এবং দক্ষ কর্মীরা যদি উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাহলে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক পরিচয় বা মতপার্থক্যের কারণে যারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন, অথচ কোনো ধরনের অর্থনৈতিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাদের আবার উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ।

বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখাও কঠিন। আবার সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে গেলে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হতে পারে অথবা করের বোঝা বাড়াতে হতে পারে। ঋণনির্ভর বিনিয়োগ ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক দায় বাড়ায়। অন্যদিকে কর বৃদ্ধি পেলে মানুষের হাতে থাকা ব্যয়যোগ্য আয় কমতে পারে, যার প্রভাব ভোগ ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে সক্রিয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট, আস্থার ঘাটতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এসব বিষয় আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে হলে উদ্যোক্তা ও কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

সুতরাং ‘রেইনবো নেশন’ কেবল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ের একটি ধারণা হিসেবে দেখলে এর মূল উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে বৈচিত্র্যের স্বীকৃতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন কমিয়ে যারা দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতির অংশ হতে পারেন, তাদের পুনরায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য বাস্তবে অর্জন করা কঠিন।

এই জায়গাতেই ‘রি-এনগেজমেন্ট’ ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে শুধু নতুন বিনিয়োগের আহ্বান যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে তাদের আবার অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করাও প্রয়োজন। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শেষ পর্যন্ত সেখানেই।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।