বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪) এক অত্যন্ত জটিল, দ্বান্দ্বিক এবং ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে লালিত সাহিত্যিক সত্তা। ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষবৃক্ষ’ থেকে শুরু করে ‘আনন্দমঠ’, ‘রাজসিংহ’ কিংবা ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ ও ‘সাম্য’—বঙ্কিমের সাহিত্যিক ক্যানভাস যেমন বহুমুখী, তেমনই তাঁর চিন্তাধারা কলোনিয়াল আধুনিকতা ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের টানাপোড়েনে বিভক্ত। মার্কসবাদী ও সেক্যুলার সাহিত্যসমালোচকরা (যেমন: ক্ষেত্র গুপ্ত, গোপাল হালদার, সুমিত সরকার বা রোমিলা থাপার) বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যের নান্দনিক উৎকর্ষ, প্রমিত রূপকল্প নির্মাণের পাশাপাশি তাঁর ঔপনিবেশিক আনুগত্য এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদী সুরকে বস্তুনিষ্ঠভাবে চিহ্নিত করেছেন।
কিন্তু আহমদ সফা যখন বঙ্কিমচন্দ্রের বিচারে বসেন, তখন তা কোনো বস্তুনিষ্ঠ নান্দনিক সাহিত্যসমালোচনা কিংবা কলোনিয়াল ডিসকোর্সের ব্যবচ্ছেদ থাকে না; তা রূপ নেয় এক ‘নির্বাচিত ইতিহাসের উগ্র আদালতে’। সফা বঙ্কিমের সমগ্র সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে কলোনিয়াল প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে, তাঁর সাহিত্যিক দ্বান্দ্বিকতাকে মুছে ফেলে তাঁকে কেবল “মুসলিম-বিদ্বেষী উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের মূল স্থপতি” হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যিক জটিলতা ও নান্দনিক বিচার না করে কেবল বাঙালি মুসলিম মানসের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে বুদ্ধিবৃত্তিক আইনি বৈধতা দিতে বঙ্কিমকে একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক প্রতীকে রূপান্তর করা সফার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিচায়িত রাজনীতিরই অংশ।
১. নান্দনিক বিচার বনাম রাজনৈতিক বিচারসভা: বঙ্কিমকে একমাত্রিকীকরণের চক্রান্ত
একজন মহৎ সাহিত্যিকের বিচার করার সময় নান্দনিক সাহিত্যসমালোচনার মূল সূত্র হলো তাঁর রচনার বহুমাত্রিকতা (Polyphony), নান্দনিক রূপকল্প, ভাষার বিকাশ এবং তাঁর যুগের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতাকে বোঝা।
বঙ্কিমচন্দ্র একদিকে যেমন ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) বা ‘রাজসিংহ’ (১৮৮২)-এ উগ্র হিন্দু পুনরুত্থানবাদ ও মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সুর তুলেছেন, অন্যদিকে তিনি ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ (১৮৭৯) এবং ‘সাম্য’ (১৮৭৯) প্রবন্ধে সামন্তীয় জমিদারতন্ত্রের শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হেনেছেন। কিন্তু সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ এবং বিভিন্ন প্রবন্ধে বঙ্কিমকে পাঠ করার সময় তাঁর এই সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বান্দ্বিকতাকে পুরোপুরি গায়েব করে দিয়েছেন।
সফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে লিখছেন:
“বঙ্কিমচন্দ্র আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান পুরুষ হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক প্রেরণার মূল চালিকাশক্তি ছিল মুসলমান-বিদ্বেষ। বঙ্কিম আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে এমন এক হিন্দু জাতীয়তাবাদী ঢাঁচে ফেলে তৈরি করেছেন, যেখানে মুসলমান কেবল এক বহিরাগত, শত্রু এবং ধ্বংসের প্রতীক।”
এই মন্তব্যের তাত্ত্বিক অসাধুতা ও একপেশে বিচার বোঝা প্রয়োজন:
সাহিত্যিক রূপক ও টেক্সটের টেক্সচুয়াল রিডিং বাদ দেওয়া: সফা বঙ্কিমের উপন্যাসের চরিত্র বা আখ্যানের ভেতরের কলোনিয়াল বাধ্যবাধকতা না দেখে, পুরো সাহিত্যকে কেবল ‘মুসলিম-বিদ্বেষের ইশতেহার’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
একমাত্রিকীকরণ: বঙ্কিমের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর তীব্র ঔপনিবেশিক সমালোচনা বা ‘সাম্য’-র সাম্যবাদী চেতনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল ‘আনন্দমঠ’-এর কিছু নির্বাচিত অংশ দিয়ে পুরো বঙ্কিমকে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
২. ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিত বিচ্ছেদ: ‘আনন্দমঠ’ ও সেন্সরশিপের ইতিহাস গায়েব
বঙ্কিমচন্দ্র যখন ‘আনন্দমঠ’ লিখছেন (১৮৮০-৮২), তখন ভারতজুড়ে ব্রিটিশ রাজের কঠোর সেন্সরশিপ ও দমনপীড়ন বলবৎ ছিল। তৎকালীন সাহিত্যিকদের কাছে সরাসরি ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন রূপায়ন করা অসম্ভব ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, বঙ্কিম ‘সন্ন্যাসী বিদ্রোহে’র পটভূমিতে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভকে আড়াল করতে গিয়ে তৎকালীন ব্রিটিশদের শেখানো ইতিহাস—অর্থাৎ “মুসলিম শাসকরা অত্যাচারী এবং ব্রিটিশরা উদ্ধারকর্তা”—এই কলোনিয়াল ফ্রেমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাতে উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত না হয়।
কিন্তু সফা বঙ্কিমচন্দ্রের এই ঔপনিবেশিক বাধ্যবাধকতা ও সেন্সরশিপের রাজনীতিকে পুরোপুরি চেপে গেছেন। সফা দেখিয়েছেন বঙ্কিম নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং কেবলই “মুসলিম জাতিকে ধ্বংস করার জন্য” এই উপন্যাস লিখেছেন!
সফা লিখছেন:
“বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসটি বাঙালি মুসলমানের বুকে এক চিরস্থায়ী আঘাত। এই উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম্’ গানের মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলো, তা ছিল মূলত মুসলমানমুক্ত ভারত গঠনের এক সাম্প্রদায়িক পরিকল্পনা।”
এর মাধ্যমে সফা বঙ্কিমকে একজন কলোনিয়াল যুগের সাহিত্যিক হিসেবে বিচার না করে, তাঁকে বানিয়ে দিলেন আধুনিক বাঙালি মুসলিমের “প্রধান ঐতিহাসিক শত্রু”।
৩. বঙ্কিমের ‘সাম্য’ ও ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ গায়েব করার ছফীয় স্ট্র্যাটেজি
বঙ্কিমচন্দ্রকে যদি কেবল “হিন্দু জমিদারদের স্বার্থরক্ষাকারী” বা “মুসলিম-বিদ্বেষী” হিসেবে খাড়া করা হয়, তবে তাঁর ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ ও ‘সাম্য’ প্রবন্ধ দুটি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে বঙ্কিম স্পষ্ট লিখেছেন:
“হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত—উভয়েই আমাদের দেশের কৃষক। একজন মুসলমান, অপরজন হিন্দু। জমিদার ও মহাজনের শোষণে উভয়ই সমানভাবে নিঃস্ব।”
এখানে বঙ্কিম হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের কৃষককে শোষিত শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং জমিদার প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। একই সাথে ‘সাম্য’ গ্রন্থে তিনি রুশো ও ভলতেয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে সাম্যবাদ ও নারী অধিকারের কথা বলেছেন।
কিন্তু সফা তাঁর সমালোচনায় বঙ্কিমের এই শোষিত প্রজা-বান্ধব ও সাম্যবাদী লেখালিখি নিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকেন অথবা সেগুলোকে “আন্তরিকতাহীন বিলাসিতা” বলে উড়িয়ে দেন। সফার রাজনৈতিক প্রজেক্টের জন্য বঙ্কিমকে “দয়ালু বা সাম্যবাদী” হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব ছিল না; বঙ্কিমকে দরকার ছিল এক অখণ্ড ‘খলনায়ক’ হিসেবে, যাকে দেখিয়ে মুসলিম জনমানসে প্রতিক্রিয়াশীল ক্ষোভ উসকে দেওয়া যায়।
৪. সাহিত্যসমালোচনার জায়গায় ‘ভিকটিমহুড কার্ড’ স্থাপন
আহমদ সফা বঙ্কিমচন্দ্রের সমালোচনার নামে বস্তুত সাহিত্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়েছেন। সাহিত্যসমালোচনার মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল:
১. বঙ্কিমের রচনার প্রমিত ভাষা ও ঔপন্যাসিক কাঠামোর মহত্ত্ব স্বীকার করা।
২. তাঁর রচনার ভেতরে থাকা উগ্র সাম্প্রদায়িক সুর ও ঔপনিবেশিক বশ্যতার তীব্র ও বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক সমালোচনা করা।
কিন্তু সফা প্রথম অংশটি (নান্দনিক রূপ) পুরোপুরি বর্জন করে দ্বিতীয় অংশটিকে উগ্র সাম্প্রদায়িক রূপ দেন।
সফা লিখছেন:
“বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালি মুসলমানকে আঘাত করেছেন, আর বাঙালি মুসলমান সেই আঘাতের জবাবে নিজের জাতীয় অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে। সুতরাং বাঙালি মুসলমানের যে স্বাতন্ত্র্যবাদী মন, তার প্রধান ভাস্কর হলেন বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং।”
এই যুক্তির মাধ্যমে সফা একটি চরম বিপজ্জনক তাত্ত্বিক সিদ্ধান্ত দিলেন: বাঙালি মুসলিমের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ ও দ্বিজাতিতাত্ত্বিক মানসিকতা নাকি তৈরি হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস পড়ে!
এটি সাহিত্য বিশ্লেষণের নামে একটি জাতিকে ঐতিহাসিক ‘ভুক্তভোগী’ (Victim) বানানোর কুৎসিত রাজনৈতিক খেলা। সামাজিক, اقتصادی ও রাজনৈতিক কারণকে দূরে ঠেলে দিয়ে একটি উপন্যাস বা সাহিত্যিককে একটি জনগোষ্ঠীর উগ্র সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার “প্রধান কারণ” বানিয়ে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল ইতিহাসপাঠ নয়।
বর্তমান বাংলাদেশে ‘বঙ্কিম-বিদ্বেষ’ ও সাহিত্য বর্জনের কালচারাল রাজনীতি
আজকের বাংলাদেশে ক্লাসিক বাংলা সাহিত্য, রেনেসাঁসের সৃষ্টি এবং সেক্যুলার সাহিত্যিকদের ঢালাওভাবে বাতিল করার যে উগ্র ঝোঁক দেখা যায়, তার তাত্ত্বিক রূপকার হলেন আহমদ সফা।
যখন উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে যে—”বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পাঠ করা মুসলিমদের জন্য হারাম বা অপমানজনক”;
যখন তারা বাংলা সাহিত্যকে “হিন্দুদের তৈরি বিদ্বেষমূলক সাহিত্য” বলে পাঠ্যবই থেকে বঙ্কিমের উপন্যাস বাদ দিতে চায়;
এবং যখন তারা সাহিত্যিক নান্দনিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেবল ‘ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট’ দিয়ে সাহিত্য বিচারের উগ্র আদালত বসায়—
তখন তারা মূলত আহমদ সফার এই বঙ্কিম-বিচারের ফ্রেমটিকেই ব্যবহার করে। সফা বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক সুরের প্রগতিশীল ও সেক্যুলার ব্যবচ্ছেদ করেননি; তিনি বঙ্কিমকে খলনায়ক বানিয়ে সাধারণ মুসলিমদের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সংকুচিত করেছেন এবং তাদের ঠেলে দিয়েছেন এক চিরন্তন সংঘাতময় সাম্প্রদায়িক মনস্তাত্ত্বিক গহ্বরে।
সাহিত্যের বস্তুনিষ্ঠ পাঠের প্রয়োজন
বঙ্কিমচন্দ্র ত্রুটিহীন ছিলেন না; তাঁর সাহিত্যে ঔপনিবেশিক দাসত্ব এবং হিন্দু পুনরুত্থানবাদের বিষাক্ত উপাদান বিদ্যমান ছিল। কিন্তু সেই উপাদানের বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিহাসভিত্তিক সমালোচনা করার বদলে তাকে উগ্র সাম্প্রদায়িক ক্ষোভের সলতে বানিয়ে তোলা এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল কাজ।
আহমদ সফা বঙ্কিমচন্দ্রকে নান্দনিক সাহিত্যের ক্ষেত্র থেকে টেনে এনে একটি ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক বিচারের আদালতে’ আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি বঙ্কিমের ক্ষতি করতে পারেননি; কিন্তু বাঙালি মুসলিম সমাজকে আধুনিক সাহিত্যরস আস্বাদন, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা ও সেক্যুলার ইতিহাসপাঠের মহৎ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে গেছেন।