রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির একজনের পরা শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের দিন ঘটনাস্থলে থাকা রংপুর মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তার গায়েও একই ধরনের শার্ট দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে পুলিশ বলছে, একই ধরনের পোশাক একাধিক ব্যক্তির পরা অস্বাভাবিক নয়।
শনিবার (২২ আগস্ট) রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রোববার কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তে এখন পর্যন্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। তাঁদের দুজনের বাড়িই মাছুয়াপাড়া এলাকায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর ওই ভবনে বসেই দুই যুবক ইয়াবা সেবন করেছিলেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে তাঁদের একজন পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগান এলাকায় গিয়ে আত্মগোপন করেন। পরে তুতবাগানের পাশে দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা
হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে ধারণ করা স্থানীয় বিভিন্ন ফেসবুক পাতার সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের শার্ট পরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখা যায়। তাঁর মুখে মাস্ক ছিল। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তি রংপুর মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা।
এদিকে গ্রেপ্তার দুই আসামির একজনের পরনেও একই ধরনের শার্ট দেখা যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। অনেকে বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখলেও এ ধরনের পোশাক একই সময়ে ভিন্ন ব্যক্তির পরা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা।
শার্টের মিলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হলেও তদন্তে এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানায়নি। ফলে শুধু পোশাকের মিলের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য
শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুই যুবক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা কেনেন। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় বসে তাঁরা ইয়াবা সেবন করেন।
পরে রাতের শেষ দিকে তাঁরা দেবু নামের এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান বলে পুলিশের কাছে দাবি করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনের সময় শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে চলে আসেন। তখন তিনি খালি গায়ে ছিলেন এবং গলায় গামছা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এরপর কীভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় এবং এতে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। চারজনের হত্যার ঘটনায় তদন্তের পাশাপাশি ঘটনাস্থল, মরদেহ উদ্ধারের পরিস্থিতি এবং আসামিদের দেওয়া বক্তব্যও যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্তে যে অগ্রগতি হয়েছে, তাতে তিনি সন্তুষ্ট। একই সঙ্গে পুলিশের ভালো কাজের প্রশংসা এবং কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থাকলে তার সমালোচনা করার আহ্বান জানান তিনি। তদন্তের বিষয়ে জনগণকে পুলিশের ওপর আস্থা রাখার কথাও বলেন।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাঁদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুই যুবক আদালতে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের জবানবন্দি নেওয়া হয়ে যাওয়ায় নতুন করে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি বলে জানান তিনি।
তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা কী কী তথ্য দিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার ধরন কী এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা কারণ রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনার পাশাপাশি তদন্তের প্রকৃত তথ্যই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









