জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

সরকারি দামে সার মিলছে না, বাড়তি দামে কিনছেন কৃষক

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় আমন ধানের আবাদ শুরুর সময় সরকারি নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাঁদের দাবি, অনুমোদিত সার ডিলারের দোকানে গেলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় সার নেই বলে জানানো হচ্ছে। পরে একই সার খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে কিনতে গেলে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। এতে আমন চাষের শুরুতেই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।

কেশবপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের কৃষক শাহজাহান খাঁ তিন একর জমিতে আমন চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করেছেন। গত শনিবার তিনি সার কিনতে কালিশুরি বাজারের মেসার্স তপন ট্রেডার্সে যান। সেখানে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে পরে এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে এক বস্তা টিএসপি ও এক বস্তা ইউরিয়া কেনেন ৩ হাজার ১০০ টাকায়। অথচ সরকারি নির্ধারিত দরে এই দুই বস্তা সারের দাম হওয়ার কথা ২ হাজার ৭০০ টাকা। ফলে তাঁকে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা দিতে হয়েছে।

শাহজাহান খাঁর অভিযোগ, ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার পাওয়া না যাওয়ায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনছেন। সেখানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি তাঁর।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন নওমালা ইউনিয়নের বটকাজল এলাকার কৃষক গোকুল বিশ্বাস ও জুরান হাওলাদার এবং বাউফল সদর ইউনিয়নের অলিপুরার কৃষক জসিম উদ্দিন। গোকুল বিশ্বাস বর্গাচাষি হিসেবে তিন একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেছেন। তিনিও ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে এক বস্তা টিএসপি ও এক বস্তা ইউরিয়া ৩ হাজার ১০০ টাকায় কিনেছেন বলে জানান।

কৃষকদের অভিযোগের সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত দামের পার্থক্যও স্পষ্ট। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা করে। ডিএপি সারের নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি সারের দাম ১ হাজার টাকা। অর্থাৎ ইউরিয়া ও টিএসপির ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের তুলনায় বাজারে অভিযোগ করা বাড়তি দাম যথেষ্ট বেশি।

বাউফল উপজেলায় সরকার অনুমোদিত সার ডিলার রয়েছেন ১৫ জন। তাঁদের অধীনে সাব-ডিলারের সংখ্যা ১০৫। নির্ধারিত কাঠামোর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সার পৌঁছানোর কথা থাকলেও আমন মৌসুমে সেই সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চাষিরা।

বিশেষ করে উপজেলার চরাঞ্চলে আমন ধানের আবাদ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ সময়ে ইউরিয়া ও টিএসপির চাহিদা বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে এক বস্তা ইউরিয়া কিনতে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। টিএসপির দাম কোথাও কোথাও ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ডিএপিও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

দাশপাড়ার কৃষক এমরান ঢালি বলেন, সারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি থাকার সময়ই অনেক দোকানে সার নেই বলে জানানো হয়। পরে বেশি দাম দিতে রাজি হলে সার পাওয়া যায়—এমন অভিযোগ তাঁর।

ধুলিয়া ইউনিয়নের ধুলিয়া গ্রামের কৃষক জব্বার প্যাদার অভিযোগ, ইউনিয়নের ডিলারের কাছে সার চাইলে তাঁকে বলা হয়েছে, সার খুচরা দোকানিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা সরবরাহ কম এবং পরিবহন ব্যয়ের কথা বলে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলে দাবি করছেন।

তবে কৃষকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কয়েকজন ডিলার ও ব্যবসায়ী। কালিশুরি বাজারের মেসার্স তপন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তপন কুমার বলেন, তিনি নির্ধারিত দামেই কৃষক ও দোকানিদের কাছে সার বিক্রি করেন। কোনো খুচরা বিক্রেতা বেশি দামে সার বিক্রি করলে সেটি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়।

নওমালা ইউনিয়নের ডিলার মেসার্স বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান মামুনও একই কথা বলেন। তাঁর দাবি, কৃষকেরা খুচরা দোকান থেকে সার কিনে বেশি দাম দিলে তার দায় ডিলারের ওপর বর্তায় না।

কয়েকজন সাব-ডিলারের বক্তব্য, ডিলারের কাছ থেকে সার নেওয়ার পর পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে তাঁদের বস্তাপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা লাভ থাকে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তবে তাঁদের কাছ থেকে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে।

কালাইয়া বাজারের চিত্ত মাস্টার স্টোরের মালিক ও ইউনিয়নের ডিলার জয়দেব দেবনাথ বলেন, কৃষক ও দোকানিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে সার বিক্রির ব্যবস্থা তাঁদের নেই। তাঁর দাবি, তাঁরা এক বস্তা সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন। পরে দোকানিরা কী দামে বিক্রি করছেন, সেটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

বাংলাদেশ সার ব্যবসায়ী সমিতির বাউফল উপজেলা শাখার সভাপতি মাসুদ রানাও ডিলারদের পক্ষেই বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, ডিলাররা সরকারি নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করেন। তবে গ্রামগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ী বাড়তি দামে সার বিক্রি করতে পারেন।

এদিকে চলতি আমন মৌসুমে বাউফলে বড় পরিসরে ধান চাষের প্রস্তুতি চলছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ উপজেলায় আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে। আউশ ধানের লক্ষ্যমাত্রা ২ হাজার ৮০৬ হেক্টর। জুলাই মাসে উপজেলার ১৫ জন ডিলারের জন্য ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ছিল ২৯৫ টন। আগস্ট মাসে সেই বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৭৭০ টন।

বিষয়তথ্য
বাউফলে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা৩৪,৮০০ হেক্টর
বাউফলে আউশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা২,৮০৬ হেক্টর
অনুমোদিত সার ডিলার১৫ জন
সাব-ডিলার১০৫ জন
ইউরিয়ার সরকারি দাম১,৩৫০ টাকা/বস্তা
টিএসপির সরকারি দাম১,৩৫০ টাকা/বস্তা
ডিএপির সরকারি দাম১,০৫০ টাকা/বস্তা
এমওপির সরকারি দাম১,০০০ টাকা/বস্তা
জুলাইয়ে ইউরিয়া বরাদ্দ২৯৫ টন
আগস্টে ইউরিয়া বরাদ্দ৭৭০ টন
অভিযোগ অনুযায়ী ইউরিয়ার দাম১,৬০০–১,৭০০ টাকা/বস্তা
অভিযোগ অনুযায়ী টিএসপির দাম১,৭০০–১,৭৫০ টাকা/বস্তা

সারের দাম নিয়ে কৃষকদের অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহরিয়ার রিজভী লিমন। তিনি বলেন, কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষকদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ আমন চাষের শুরুতেই জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও পরবর্তী পরিচর্যায় সারের প্রয়োজন হয়। নির্ধারিত দামে সার না পেলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। বিশেষ করে বর্গাচাষি ও ছোট কৃষকদের ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত কয়েক শ টাকা খরচ পুরো মৌসুমের হিসাবেই বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

এ অবস্থায় কৃষকদের দাবি, ডিলার ও সাব-ডিলার পর্যায়ে সারের বরাদ্দ, সরবরাহ ও বিক্রয়ব্যবস্থা নিয়মিত তদারক করা দরকার। একই সঙ্গে সরকারি দামে সার বিক্রি হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে। এতে সরবরাহে কোনো ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করা এবং বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর