জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

দেশে খুন বাড়ছে, জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ

সারাদেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হত্যার ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়। সাত মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৯৬টি হত্যার মামলা হয়েছে।

শুধু গত তিন মাসের হিসাবও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে। মে, জুন ও জুলাই—এই তিন মাসে হত্যার ঘটনায় মোট ৯৩৪টি মামলা হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে মামলা হয়েছে প্রায় ৩১১টি। জুলাইয়ে মামলার সংখ্যা আগের মাসের তুলনায় কিছুটা কমলেও হত্যাকাণ্ডের সার্বিক প্রবণতায় বড় ধরনের উন্নতির চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়েও দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত রোববার বাগেরহাট, ফরিদপুর, পাবনার ঈশ্বরদী, জামালপুর ও ঝিনাইদহে পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর আগের দিন শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই পরিবারের সদস্যদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের দুই সন্তান ছিলেন।

নানা কারণে ঘটছে হত্যাকাণ্ড

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। ব্যক্তিগত বিরোধ ও পারিবারিক কলহের পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব, মাদককেন্দ্রিক বিরোধ, কিশোরদের অপরাধী তৎপরতা, গোষ্ঠীগত সংঘাত এবং জমিজমা নিয়ে বিরোধ থেকেও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করছে। কোথাও আবার চিহ্নিত অপরাধীদের দ্বন্দ্ব কিংবা পুরোনো বিরোধ নতুন করে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। কিছু ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। ফলে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সমকালের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের সাত মাসে সারাদেশে ১২৩টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৯ জন। একই সঙ্গে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১০৯টি চীনা রাইফেল ও ৩০টি স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়া ২ লাখ ৫৭ হাজার ১২৫টি গুলি এখনো উদ্ধার হয়নি বলে তথ্য রয়েছে। অপরাধী চক্রগুলোর হাতেও অবৈধ আধুনিক অস্ত্র থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ঢাকায় তিন মাসে ৭০ হত্যার মামলা

মহানগরগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৩১টি হত্যার মামলা হয়েছে। জুনে এ সংখ্যা ছিল ২৩ এবং মে মাসে ১৬। অর্থাৎ মে থেকে জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকা মহানগরে মোট ৭০টি হত্যার মামলা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাবে এ সময়ে ঢাকায় হত্যার মামলা ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

জুলাইয়ে চট্টগ্রাম মহানগরে চারটি, খুলনায় তিনটি, রাজশাহীতে একটি, সিলেটে পাঁচটি এবং গাজীপুরে সাতটি হত্যার মামলা হয়েছে। ওই মাসে বরিশাল ও রংপুর মহানগরে হত্যার মামলা হয়নি।

জুলাই মাসে বিভিন্ন পুলিশ অঞ্চলের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। ঢাকা অঞ্চলে ৬৬টি হত্যার মামলা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ। এরপর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৫৪টি, খুলনায় ২৯টি, ময়মনসিংহে ২৭টি, রাজশাহীতে ২৪টি, রংপুরে ১৮টি, সিলেটে ১৫টি এবং বরিশাল অঞ্চলে ১৪টি মামলা হয়েছে।

মে ও জুনেও ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে হত্যার মামলা তুলনামূলক বেশি ছিল। মে মাসে ঢাকা অঞ্চলে ৭২টি এবং চট্টগ্রামে ৭১টি মামলা হয়। জুনে ঢাকা অঞ্চলে ৭৪টি ও চট্টগ্রামে ৬৭টি মামলা হয়। তিন মাসে ঢাকা অঞ্চলে মোট ২১২টি এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৯২টি হত্যার মামলা হয়েছে। একই সময়ে খুলনা অঞ্চলে মামলা হয়েছে ৮৫টি।

আগের বছরের তুলনাতেও উদ্বেগ

পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যানে বিভিন্ন বছরের হত্যার মামলার সংখ্যায় ওঠানামা দেখা যায়। ২০২৫ সালের মে, জুন ও জুলাইয়ে হত্যার মোট মামলা ছিল যথাক্রমে ৩৪১, ৩৪৪ ও ৩৬২টি। তবে এসব মামলার মধ্যে আগের সময়ের ঘটনার কিছু মামলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। আগের ঘটনার মামলা বাদ দিলে ওই তিন মাসে প্রকৃত হত্যার মামলা দাঁড়ায় যথাক্রমে ২৬১, ২৪৯ ও ২৭২টি। তিন মাসে প্রকৃত হত্যার ঘটনা ছিল ৭৮২টি, গড়ে প্রায় ২৬০টি করে।

২০২৪ সালের মে, জুন ও জুলাইয়ে হত্যার মামলা ছিল যথাক্রমে ২৫৯, ২৬৮ ও ৩৩৪টি। ওই তিন মাসে মোট মামলা ছিল ৮৬১টি। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৮৭টি মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে হত্যার মামলার সংখ্যা ছিল ৬২৬টি; এর মধ্যে আগের বছরের ঘটনাসংক্রান্ত ১৫৮টি মামলা ছিল।

২০২৩ সালে সারাদেশে হত্যার মোট মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ২৩টি। ওই বছর মাসে গড়ে প্রায় ২৫১টি মামলা হয়েছে। মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে মামলা হয়েছিল ৮১৪টি, অর্থাৎ গড়ে প্রায় ২৭১টি করে।

রাজনৈতিক বিরোধও বড় কারণ

হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্যের সংঘাতের বিষয়টিও উঠে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় ৪০০টি সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজনৈতিক বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে রূপ না নিলেও আধিপত্য বিস্তার, স্থানীয় প্রভাব ধরে রাখা কিংবা পুরোনো বিরোধ মেটানোর নামে সহিংসতার পথ তৈরি করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত ১৭ আগস্ট সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের বলেন, বিগত ছয় মাস বা ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ সন্তুষ্ট কি না, সেটি জনগণই মূল্যায়ন করবে। তাঁদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও সুসংহত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে নানা ধরনের পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সংযুক্তি, বদলি, চাকরি হারানোর আশঙ্কা, মামলায় আসামি হওয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের প্রচারণার কারণে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের সময় বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এসব বিষয়ের প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। একই সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী এবং বিদেশ থেকে দেশে ফেরা অপরাধীদের তৎপরতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। তাঁদের কেউ এলাকায় নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড

গত ৬ আগস্ট রাজধানীর সবুজবাগ থানার বাগানবাড়ী কালভার্ট এলাকার একটি গরুর খামারের পাশে সেতুর নিচে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর খণ্ডিত মাথা ও পলিথিনে মোড়ানো দুই হাত উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ওই নারীর নাম ছুরাইয়া আক্তার ওরফে ফালানী, বয়স ১৯ বছর। বাবা-মা খণ্ডিত মাথার ছবি ও দুই হাতে থাকা উল্কির চিহ্ন দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

খুলনাতেও আগস্ট মাসে একাধিক সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। ২০ আগস্ট বটিয়াঘাটায় নদী থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই রাতে দিঘলিয়া উপজেলায় বিদ্যালয় ছুটির প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর একটি বিদ্যালয়ের শৌচাগার থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় এক ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়।

১৯ আগস্ট শহরের লবণচরায় জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আশিবিঘা এলাকায় মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে দুই তরুণ নিহত হন। ১৮ আগস্ট রায়েরমহল এলাকায় শিশু অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে রাজু নামের ২৬ বছর বয়সী এক যুবক নিহত হন। ১৫ আগস্ট জয় ঢালী নামের ২৭ বছর বয়সী এক যুবককে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ১১ আগস্ট ফখরুল শেখ নামের ৩২ বছর বয়সী এক যুবককে ইটভাটায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ খুলনা ও চট্টগ্রাম এলাকায় কিছু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভাড়াটে খুনি, চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক জলদস্যুদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

তদন্ত ও প্রতিরোধে জোর

পুলিশ সদরদপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, মাসে হত্যার মামলার সংখ্যা প্রায় ৩০০-এর কাছাকাছি থাকে। ব্যক্তিগত শত্রুতা ও আকস্মিক ক্রোধ থেকেও অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটে, যেগুলো আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। তাঁর মতে, কোনো কোনো সময়ে হত্যার ঘটনা বাড়ে, আবার কোনো সময়ে কমে।

তিনি আরও জানান, খুলনা, চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় হত্যাকাণ্ড তুলনামূলক বেশি ঘটছে। এসব ঘটনার বড় অংশের রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি করেছে পুলিশ। নিয়মিত অপরাধ পর্যালোচনা সভায় হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধ কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

সার্বিক পরিসংখ্যান বলছে, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা মাসভেদে কমবেশি হলেও প্রতি মাসে প্রায় ৩০০টি মামলা হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় সতর্কসংকেত। অপরাধের কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক ও স্থানীয় বিরোধ নিরসন এবং দ্রুত তদন্তের ওপর জোর না দিলে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কঠিন হতে পারে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর