বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি নানাবিধ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিম ফুটবলারদের ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ম্যাচ সেরার পুরস্কার বা ‘প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ’ প্রদানের ক্ষেত্রে স্পন্সরের নাম প্রদর্শন নিয়ে এই বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপে ম্যাচ সেরার পুরস্কার দেওয়ার পেছনে সরাসরি যুক্ত ছিল একটি বহুজাতিক মদ প্রস্তুতকারী সংস্থা। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে উরুগুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর মিশরের গোলকিপার মোহাম্মদ আল শেনাওই ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে পুরস্কারের ট্রফিতে মদের ব্র্যান্ডের লোগো থাকায় তিনি সেটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
বিজ্ঞাপনী প্রচার ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের সংঘাত
চলতি বিশ্বকাপে অনলাইনে ফুটবল সমর্থকদের সরাসরি ভোটে প্রতিটি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হচ্ছেন। এই পুরস্কার প্রদানের দায়িত্বে ফিফার সহযোগী পার্টনার হিসেবে কাজ করছে ‘মাইকেল আলট্রা’ নামের একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, পুরস্কার জেতার পর ফুটবলাররা ট্রফি হাতে নিয়ে স্পন্সরের নাম ও লোগো সম্বলিত ব্যাকড্রপের (পেছনের পর্দা) সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। পরবর্তীতে ফিফা তাদের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবিগুলো প্রকাশ করে।
যেহেতু এই স্পন্সর প্রতিষ্ঠানটি মূলত অ্যালকোহল বা মাদক উৎপাদনকারী একটি ব্র্যান্ড এবং ইসলাম ধর্মে মদ্যপান ও এর প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তাই মুসলিম ফুটবলাররা এই ব্র্যান্ডের লোগোসহ ছবি তুলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। বিশেষ করে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে মদ্যপান ও এর বিপণন নিয়ে অত্যন্ত কড়া আইন রয়েছে। খেলোয়াড়দের এই ধর্মীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতার কথা বিবেচনা করেই ফিফা নিয়মে নমনীয়তা এনেছে।
নতুন নিয়মের প্রয়োগ ও বৈশ্বিক প্রশংসা
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো মুসলিম ফুটবলার যদি ম্যাচের সেরা নির্বাচিত হন, তবে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চের ব্যাকড্রপ থেকে ওই নির্দিষ্ট মাদক কোম্পানির নাম ও লোগো পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই নিয়ম ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হয়েছে। কানাডার ইসমাইল কোনে, কাতারের মাহমুদ আবুনাদা এবং মরক্কো বংশোদ্ভূত ইসমাইল সাইবাড়িরা ম্যাচ সেরা হওয়ার পর এই নিয়মের সুবিধা পেয়েছেন।
এই ফুটবলারদের পুরস্কার নেওয়ার সময় পেছনের পর্দায় মদের ব্র্যান্ডের বদলে কেবল ‘Superior player of the match’ লেখা থাকছে এবং তার পাশে ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ট্রফির মূল নকশা একই থাকছে, শুধু সেখান থেকে মদের কোম্পানির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফুটবল বিশ্বে বিজ্ঞাপনী প্রচারের এমন বিরোধিতা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের তারকা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে ম্যাচ সেরা হওয়ার পর ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রফিতে থাকা মদের লোগোটি হাত দিয়ে ঢেকে ছবি তুলেছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন কোনো মদ বা জুয়া সংস্থার বিজ্ঞাপনে তিনি অংশ নেবেন না।
বিশ্বকাপের বাইরে ঘরোয়া ফুটবলেও এখন অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। উদাহরণস্বরূপ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যাচ শেষে ঐতিহ্যগতভাবে উদযাপনের জন্য শ্যাম্পেনের বোতল দেওয়া হলেও, মুসলিম খেলোয়াড়দের উপস্থিতির কারণে এখন অনেক ক্ষেত্রেই নন-অ্যালকোহলিক বা কোমল পানীয় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফুটবলারদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের প্রতি ফিফার এই নমনীয় মনোভাব এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে বিপুল প্রশংসা কুড়াচ্ছে।









