পশ্চিমবঙ্গের সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার সকালে রামপুরহাটে তাঁর বাড়ির কাছের একটি দলীয় কার্যালয় থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে একটি কথিত আত্মহত্যার চিঠিও উদ্ধার করা হয়েছে। চিঠিতে নিজের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে চিঠিটির সত্যতা পুলিশ তদন্ত করে দেখছে এবং মৃত্যুর সঠিক কারণও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, রামপুরহাট পৌরসভার হাটতলা পাড়ায় নিজের বাড়ির কাছেই তৃণমূল কংগ্রেসের ওই কার্যালয়ে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মরদেহ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখা হলেও মৃত্যুর পেছনের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া এক পাতার কথিত চিঠিতে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক থাকার সময়ও তিনি কোনো দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়নি বলেও তিনি লিখেছেন।
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়েও চিঠিতে ব্যাখ্যা দিয়েছেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাজে তাঁর ভূমিকা সীমিত ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ সভায় অংশ নেওয়া ছাড়া সেখানে তাঁর কোনো দায়িত্ব ছিল না। তিনি টেন্ডার কমিটির সদস্য ছিলেন না, চেকে স্বাক্ষর করার ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। এমনকি পরিকল্পনা অনুমোদন বা অনাপত্তি সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন।
চিঠিতে নিজেকে অপমানিত ও হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে একপর্যায়ে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্তকে নিজের ভুল বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে পরিবারের তরুণ সদস্যদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে নিজ নিজ পেশায় মনোযোগী হওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
নিজের শিক্ষকতা জীবনের কথাও চিঠিতে স্মরণ করেছেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করার পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া এবং অনেক শিক্ষার্থীকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সম্মানের কথাও সেখানে উঠে এসেছে।
চিঠির শেষাংশে পরিবারের সদস্যদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে স্পষ্টভাবে লিখে যান, তাঁর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। পুলিশ অবশ্য চিঠিতে লেখা বক্তব্য, মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় যাচাই করছে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় রামপুরহাট আসন থেকে ২০০১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন। এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রিসভায় স্কুলশিক্ষা ও কৃষি দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারও ছিলেন।
চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও কমে এসেছিল। এর আগে জুন মাসে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বীরভূম জেলা মূল কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে দলীয় সদস্য হিসেবে থাকার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
৭৪ বছর বয়সী এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। পুলিশ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কথিত চিঠির তথ্য পর্যালোচনা করছে। তদন্তের অগ্রগতির ওপরই এখন নির্ভর করছে তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে কি না।









