,

মাদ্রাসায় ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু, জিজ্ঞাসাবাদে সুপার-শিক্ষিকা

নাটোরের গুরুদাসপুরে একটি মহিলা হাফেজিয়া মাদ্রাসার ভেতর খাদিজা খাতুন (১৬) নামে এক আবাসিক ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের শ্যামপুর ওয়াপদা বাজার এলাকায় হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.) মহিলা হাফেজিয়া মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে।

খাদিজার মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার শরীরে প্রাথমিকভাবে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে কী পরিস্থিতিতে মাদ্রাসার ভেতরে তার মৃত্যু হলো, সে বিষয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় ঘটনাটি তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাদ্রাসা থেকে খাদিজাকে তার মা ও খালু নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল বলে চিকিৎসক জানান।

নিহত খাদিজা খাতুন সিংড়া উপজেলার শালিখা গ্রামের মৃত খলিল উদ্দিনের মেয়ে। তিনি হযরত রাবেয়া বসরী (রহ.) মহিলা হাফেজিয়া মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্রী ছিলেন এবং সেখানে থেকে পবিত্র কোরআন হিফজ করছিলেন।

খাদিজার মৃত্যুর খবর সন্ধ্যার দিকে এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। খবর পেয়ে গুরুদাসপুর থানা পুলিশ ও নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ঘটনাস্থলে যায়। ডিবির ওসি নজরুল ইসলাম মাদ্রাসা পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় খাদিজার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর ধরন ও পরিস্থিতি স্পষ্ট না হওয়ায় মাদ্রাসার সুপার সুলাইমান সরদার (৩৮) এবং তার স্ত্রী ও মাদ্রাসার শিক্ষিকা মদিনা খাতুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং খাদিজাকে হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সুলাইমান সরদার শ্যামপুর গ্রামের গোকুল সরদারের ছেলে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হওয়ায় তার ও তার স্ত্রীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, খাদিজাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মা মাদ্রাসার গোসলখানায় পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার কথা বলেছিলেন। আবার কোথাও কোথাও তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার কথাও ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব তথ্যের কোনোটিই এখন পর্যন্ত পুলিশ বা চিকিৎসকের পক্ষ থেকে মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ হিসেবে বলা হয়নি।

মৃত্যুর পর খাদিজার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো নিয়েও নাটোর সদর হাসপাতালের সামনে কিছু সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্তে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক জানান, খাদিজাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। ময়নাতদন্তের পর তার মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বলেন, ওই মাদ্রাসায় বেশ কয়েকজন ছাত্রী আবাসিকভাবে থেকে কোরআন হিফজ করছেন। মাদ্রাসার ভেতরেই একজন ছাত্রীর মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, পরিবারের আপত্তি থাকলেও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে খাদিজার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ হত্যাকাণ্ড বা দুর্ঘটনা—কোনোটিকেই চূড়ান্তভাবে দায়ী করেনি। একইভাবে স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া গোসলখানায় পড়ে যাওয়া বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার তথ্যও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে খাদিজার মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তাকে মাদ্রাসা থেকে কখন এবং কী অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং তার মৃত্যুর পেছনে কোনো দুর্ঘটনা, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে।

একজন কিশোরী আবাসিক শিক্ষার্থীর মাদ্রাসার ভেতরে আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার নিরসনে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ময়নাতদন্তের ফল এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।