খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:৫২ এএম

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় মাদকের টাকার জন্য নিজের জন্মদাতা পিতা ও দুগ্ধপোষ্য শিশুপুত্রকে হত্যাচেষ্টা এবং বসতবাড়ি ভাঙচুরের এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। মাদকাসক্তির ভয়াল গ্রাসে একজন যুবক কতটা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়তে পারে, এই ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। এই অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত যুবক রাজু মিয়াকে (২৩) ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত রাজু মিয়া ধুনট উপজেলার গোপালনগর ইউনিয়নের বাঁশপাতা গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, রাজু দীর্ঘ দিন ধরে মরণনেশা ইয়াবায় আসক্ত ছিলেন। মাদকের অর্থের জোগান দিতে তিনি প্রতিনিয়ত তার বাবার কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করতেন। চাহিদামতো টাকা না পেলেই শুরু হতো পৈশাচিক নির্যাতন।
মাদকের অর্থ না পেয়ে রাজু কেবল তার বৃদ্ধ পিতাকে মারধর করেই ক্ষান্ত হতেন না, বরং নিজের অবুঝ শিশুপুত্রকেও হত্যার চেষ্টা চালাতেন। তার এই উগ্র মেজাজ ও নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি ঘরের আসবাবপত্রও। পারিবারিক কলহ ও নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছায়, তখন প্রায় ছয় মাস আগে রাজুর স্ত্রী নিজের কোলের শিশুকে পাষণ্ড স্বামীর কাছে রেখে প্রাণভয়ে পিত্রালয়ে চলে যেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে শিশুটির জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ছেলের ক্রমাগত নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং নাতির জীবন রক্ষার্থে বাবা বেলাল হোসেন নিরুপায় হয়ে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন রাজু মিয়ার ওপর নজরদারি শুরু করে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের একটি বিশেষ দল বাঁশপাতা গ্রামে রাজুর বাড়িতে অভিযান চালায়। অভিযানে রাজু মিয়াকে নিজ ঘরে হাতেনাতে ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় আটক করা হয়। ধুনট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুজ্জামান ঘটনাস্থলেই আদালত পরিচালনা করেন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী তাকে দণ্ড প্রদান করেন।
নিচে ঘটনার প্রধান তথ্যগুলো একনজরে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি | রাজু মিয়া (২৩), পিতা: বেলাল হোসেন |
| ঠিকানা | গ্রাম: বাঁশপাতা, ইউনিয়ন: গোপালনগর, ধুনট, বগুড়া |
| অভিযোগ | মাদক সেবন, পিতাকে মারধর, শিশুকে হত্যাচেষ্টা ও ভাঙচুর |
| শাস্তির ধরন | ৯ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা |
| আদালতের ধরণ | ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) |
| বিচারক | খায়রুজ্জামান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) |
| বর্তমান অবস্থান | বগুড়া জেলা কারাগার |
এই রায়ের পর এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে সচেতন মহল মনে করছেন, মাদকের এই মরণ ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে কেবল জেল-জরিমানা যথেষ্ট নয়, বরং পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা এবং মাদক সরবরাহকারীদের শিকড় উপড়ে ফেলা জরুরি।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুজ্জামান রায়ের পর সাংবাদিকদের জানান, মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, বরং পুরো পরিবার ও সমাজকে বিষিয়ে তোলে। মাদকের টাকার জন্য আপনজনদের ওপর এমন সহিংসতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তিনি আরও ঘোষণা দেন যে, ধুনট উপজেলায় মাদক ও জুয়াবিরোধী এ ধরনের বিশেষ অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। তিনি এই অভিশাপ নির্মূলে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।
পরিশেষে, সাজাপ্রাপ্ত রাজু মিয়াকে কড়া পুলিশি পাহারায় বগুড়া জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি মাদকাসক্তদের পরিবারের জন্য একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য