দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক বিজয় স্মরণে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মস্কোর রেড স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বিজয় দিবস’ বা ‘ভিক্টরি ডে’ কুচকাওয়াজ। অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ন্যাটোর তীব্র সমালোচনা করেন এবং বর্তমান সংঘাতকে রাশিয়ার অস্তিত্ব রক্ষার একটি ‘ন্যায্য যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
Table of Contents
পুতিনের ভাষণের মূল বিষয়বস্তু
রেড স্কোয়ারে সমবেত শত শত সেনা সদস্য ও বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে পুতিন দাবি করেন, রাশিয়া বর্তমানে একটি আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যাদের নেপথ্যে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো)। তিনি ইউক্রেনকে একটি ‘আগ্রাসী শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব দেশটিকে অস্ত্র ও নৈতিক সমর্থন দিয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে। ভাষণে পুতিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত সেনাদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেন এবং বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধকে সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলনা করেন।
পুতিন তার বক্তব্যে দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক এবং সামরিক কর্মীদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রাশিয়ার ভবিষ্যৎ ও সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণভাবে দেশের জনগণের ঐক্যের ওপর নির্ভরশীল।
কুচকাওয়াজের সংক্ষিপ্ত রূপ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এটি চতুর্থ বিজয় দিবস উদযাপন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এবারের কুচকাওয়াজের ধরনে উল্লেখ্যযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শনীতে ব্যাপক সংকোচন করা হয়েছে।
| কুচকাওয়াজের বৈশিষ্ট্য | তথ্য ও বিবরণ |
| অংশগ্রহণকারী | ৯,০০০-এর বেশি সামরিক কর্মী এবং কয়েকশ সেনা সদস্য। |
| সামরিক যান | প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথমবার কুচকাওয়াজে আধুনিক ট্যাংক বা ভারী যানের উপস্থিতি ছিল না। |
| বিদেশি অতিথি | বেলারুশ, লাওস ও মালয়েশিয়াসহ সীমিত সংখ্যক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। |
| নিরাপত্তা ঝুঁকি | ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার আশঙ্কায় অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ। |
| বাতিলকৃত অনুষ্ঠান | রাশিয়ার অনেক শহরে জননিরাপত্তার খাতিরে ‘অমর রেজিমেন্ট মার্চ’ বাতিল করা হয়েছিল। |
যুদ্ধক্ষেত্রের প্রভাব ও সরঞ্জাম সংকট
মস্কোর প্যারেডে সামরিক যানের অনুপস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আধুনিক ট্যাংক ও ক্ষেপণাস্ত্র সরঞ্জামগুলো প্যারেড গ্রাউন্ডের চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি প্রয়োজন। রাশিয়ার সংসদ সদস্য ইয়েভজেনি পোপভ এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, রাশিয়ার মূল শক্তি এখন ফ্রন্টলাইনে নিয়োজিত রয়েছে। উল্লেখ্য যে, রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোতে এবং ভ্লাদিভোস্তকে আয়োজিত প্যারেডগুলোতেও আধুনিক সরঞ্জামের পরিবর্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পুরনো সামরিক যান প্রদর্শন করা হয়েছে।
কূটনৈতিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি
এবারের অনুষ্ঠানে বিদেশি নেতাদের উপস্থিতি গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, লাওসের প্রেসিডেন্ট এবং মালয়েশিয়ার রাজাসহ কয়েকজন নির্দিষ্ট মিত্র দেশের নেতারা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সামরিক ব্যান্ডের সুর ও কামানের গোলার মাধ্যমে বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত সেনাদের বিশেষ চিত্রসমূহ সম্প্রচার করা হয়।
সাময়িক যুদ্ধবিরতি ও অভিযোগ
বিজয় দিবস উপলক্ষে ৮-৯ মে রাশিয়ার পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ইউক্রেন ৬ মে থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিল। তবে এই ঘোষণার সুফল মাঠ পর্যায়ে সামান্যই পরিলক্ষিত হয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণের ঘটনা অব্যাহত ছিল।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, দেশজুড়ে ছোট বড় অনেক অনুষ্ঠান বাতিল করা হলেও রেড স্কোয়ারের কুচকাওয়াজ ছিল প্রতীকীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের মধ্যে পুতিন দেশবাসীকে বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাশিয়া তার লক্ষ্য অর্জনে অবিচল রয়েছে।
