যশোরে নিখোঁজ যুবকের গোয়ালঘরে মাটিচাপা নিথর দেহ উদ্ধার

যশোরের শার্শা উপজেলায় নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ এক মাস পাঁচ দিন পর ইকরামুল কবির (২৫) নামে এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (৯ মে) রাত ৮টার দিকে উপজেলার বসতপুর পূর্বপাড়া গ্রাম থেকে চাঞ্চল্যকর এই মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। ঘাতকরা তাকে হত্যার পর চিহ্ন মুছে ফেলতে বসতবাড়ির গোয়ালঘরের মেঝের নিচে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল। নিহত ইকরামুল কবির পুটখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ বারোপোতা গ্রামের আব্দুল রশিদের পুত্র।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নিখোঁজ সংবাদ

নিহত ইকরামুল কবির গত এক মাস পাঁচ দিন ধরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত মাসের শুরু থেকে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো হদিস না পেয়ে পরিবারটি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং বিষয়টি স্থানীয় থানা পুলিশকে অবহিত করে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার দিন ইকরামুল তাঁর পাওনা টাকা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একই উপজেলার বসতপুর গ্রামের জনৈক আলফুরাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এরপর থেকেই তাঁর মুঠোফোন বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি নিরুদ্দেশ হন।

তদন্ত ও মরদেহ উদ্ধার অভিযান

ইকরামুলের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বসতপুর গ্রামের আলফুরাদের স্ত্রী মুন্নী বেগমের (২২) সাথে নিহতের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারে। তদন্তের ধারাবাহিকতায় সন্দেহভাজন হিসেবে আলফুরাদ ও তাঁর স্ত্রী মুন্নী বেগমকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত আলফুরাদ হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন এবং মরদেহ গুম করার স্থান সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেন।

সেই তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার বিকেলে শার্শা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল বসতপুর পূর্বপাড়া গ্রামে আলফুরাদের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থিত গোয়ালঘরের মেঝে খুঁড়ে নিখোঁজ ইকরামুলের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ সময় মাটিচাপা অবস্থায় থাকায় মরদেহটি বিকৃত হতে শুরু করেছিল। উদ্ধার অভিযান প্রত্যক্ষ করতে ওই এলাকায় শত শত উৎসুক জনতা ভিড় জমায়।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশি তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে— পরকীয়া সম্পর্ক, দাম্পত্য কলহ এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে যে, অভিযুক্ত মুন্নী বেগমের সাথে ইকরামুলের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আলফুরাদ ও মুন্নীর মধ্যে প্রায়ই বিবাদ ও পারিবারিক অশান্তি লেগে থাকত।

পুলিশ আরও জানতে পেরেছে যে, সম্পর্কের পাশাপাশি তাঁদের মধ্যে বড় অংকের টাকা নিয়ে লেনদেনের বিরোধ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ইকরামুল যখন তাঁর পাওনা টাকা ফেরত চাইতে আলফুরাদের বাড়িতে যান, তখন পরিকল্পিতভাবে তাঁকে শ্বাসরোধে বা আঘাত করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে কৌশলে গোয়ালঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখা হয়।

পুলিশের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ

শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিকভাবে পরকীয়া ও পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা অভিযুক্ত দম্পতিকে আটক করেছি এবং তাঁদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সাথে আর অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকৃত মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং পুলিশ আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আশ্বাস দিয়েছে।

এলাকায় উত্তেজনা ও জননিরাপত্তা

গোয়ালঘরের নিচে মাটিচাপা অবস্থা থেকে মরদেহ উদ্ধারের এই পৈশাচিক ঘটনায় বসতপুর পূর্বপাড়া গ্রামসহ পুরো উপজেলায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে লক্ষ্যে পুলিশ কড়া নজরদারি বজায় রাখছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তুচ্ছ বিরোধ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও শোকের ছায়া বিরাজ করছে।